default-image

১৯৭১ সালের জুলাইয়ে একদিন মুক্তিবাহিনীর ১১ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে সিদ্ধান্ত হলো, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কামালপুর বিওপি ঘাঁটিতে আক্রমণ করা হবে। শুরু হলো প্রস্তুতি। আক্রমণের আগে (২৮ জুলাই) রাতে (ক্যাপ্টেন) সালাহ্উদ্দীন মমতাজ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে জায়গাটি রেকি করতে গেলেন। সাড়াশব্দহীন অন্ধকার রাত। অন্ধকারে তিনি একটি পাকিস্তানি পর্যবেক্ষণ চৌকির কাছে গেলে পাকিস্তানি এক সেনা ‘হল্ট’ বলে চিত্কার দিয়ে গুলি করতে উদ্যত হয়। অত্যন্ত সাহসী সালাহ্উদ্দীন মমতাজ সঙ্গে সঙ্গে তাকে জাপটে ধরে মাটিতে ফেলে দেন। এই সুযোগে তাঁর কাছাকাছি থাকা এক যোদ্ধা ওই পাকিস্তানি সেনাকে গুলি করেন। সেখানে ছিল আরেক পাকিস্তানি সেনা। তাকেও তাঁরা গুলি করে হত্যা করেন। এরপর তিনি ঘাঁটিতে ফিরে আসেন। এ ঘটনায় পাকিস্তানি সেনারা হতবাক ও বিস্মিত হয়। ২৯ জুলাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ কে নিয়াজি কামালপুর পরিদর্শনে যান। তাঁর নির্দেশে পাকিস্তানি সেনারা তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে।

বিজ্ঞাপন

৩১ জুলাই ছিল আক্রমণের নির্ধারিত তারিখ। ৩০ জুলাই রাতে হঠাত্ শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। ঘোর অন্ধকার ও বৃষ্টিতে মুক্তিযোদ্ধারা সময়মতো এফইউপিতে পৌঁছে অ্যাসল্ট ফর্মেশন তৈরি করতে দেরি করে ফেলেন। বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যেই সালাহ্উদ্দীন মমতাজ অ্যাসল্ট ফর্মেশন তৈরি করে আক্রমণ শুরু করেন। তুলনামূলকভাবে তিনি ছিলেন ক্ষিপ্র। ২৮ জুলাইয়ের পর তাঁর মনোবল ও আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল চাঙা করতে নিজের জীবনের নিরাপত্তার কথা না ভেবে তিনি বিওপির একদম কাছাকাছি গিয়ে মেগাফোনে পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশ করে বলতে থাকেন, ‘আভি তক ওয়াকত হ্যায়, শালালোক সারেন্ডার করো, নেহিত জিন্দা নেহি ছোড়েঙ্গা।’

তাঁর এই সাহসী ভূমিকায় মুক্তিযোদ্ধাদেরও মনোবল বেড়ে যায়। তাঁরা সালাহ্উদ্দীন মমতাজের নেতৃত্বে বীর বিক্রমে পাকিস্তানি সেনা অবস্থানের প্রায় ভেতরে ঢুকে পড়েন। মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষায় ফাটল ধরে। তখন প্রথম সারিতে থাকা পাকিস্তানি সেনারা ওই অবস্থান ছেড়ে আন্তঃসীমায় প্রতিরক্ষা অবস্থান (শেল প্রুফ বাংকারে) নেয়। এতে তিনি আরও উত্সাহী হয়ে সামনে এগিয়ে যান এবং ২০-২৫ জন সহযোদ্ধা নিয়ে কমিউনিটি সেন্টারে ঢুকে পড়েন। এ সময় অগ্রসরমাণ মুক্তিযোদ্ধারা সালাহ্উদ্দীন মমতাজকে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশ দিতে থাকেন। এ সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি গোলা এসে পড়ে তাঁর পাশে। মেশিনগানের গুলিও লাগে তাঁর মাথায়। স্তিমিত হয়ে যায় তাঁর তেজোদীপ্ত কণ্ঠস্বর। তাঁর শহীদ হওয়ার ঘটনায় কেবল সহযোদ্ধাদের মধ্যেই নয়, গোটা প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে নেতৃত্বশূন্যতা দেখা দেয় এবং তাঁরা রণাঙ্গন থেকে পিছিয়ে যেতে শুরু করেন। এভাবেই শেষ হয় কামালপুরের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর ৩০ জন শহীদ ও বিপুলসংখ্যক আহত হন। অসংখ্য পাকিস্তানি সেনাও নিহত হয়।

বিজ্ঞাপন

সালাহ্উদ্দীন মমতাজ চাকরি করতেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। তখন তাঁর পদবি ছিল ক্যাপ্টেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সেখান থেকে পালিয়ে এসে যোগ দেন যুদ্ধে। তাঁকে নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।