default-image

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন কসবা রেলস্টেশন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত। মুক্তিযুদ্ধকালে এখানে অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৩ অক্টোবর সাইদুল হকসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা সেখানে আক্রমণ করেন।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য একপর্যায়ে কসবা রেলস্টেশনে দুর্ভেদ্য ঘাঁটি তৈরি করে। স্টেশন এলাকার চারদিকে ছিল মাইনফিল্ড। এ ছাড়া ছিল পর্যবেক্ষণ পোস্ট। রাতে সাইদুল হক ও তাঁর সহযোদ্ধারা সীমান্ত অতিক্রম করে নিঃশব্দে সেখানে অবস্থান নেন। তারপর নির্দিষ্ট সময়ে ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে যান। মাইনফিল্ডের কারণে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। এতে তাঁরা দমে যাননি বা মনোবল হারাননি।

সব বাধা উপেক্ষা করে সাহসের সঙ্গে সাইদুল হক ও তাঁর সহযোদ্ধারা প্রচণ্ড আক্রমণ করেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করে। গোলাগুলিতে রাতের আকাশ লাল হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড যুদ্ধ চলতে থাকে। শত্রুসেনাদের ওপর তাঁরা বিপুল বিক্রমে চড়াও হন। তাঁদের বিক্রমে পাকিস্তানি সেনারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তারা কসবার পুরান বাজারের দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে কসবা রেলস্টেশন।

বিজ্ঞাপন

২৫ অক্টোবর পাকিস্তানি সেনারা নতুন শক্তি সঞ্চয় করে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। সাইদুল হক ও তাঁর সহযোদ্ধারা এমন আক্রমণের জন্য প্রস্তুতই ছিলেন। সাহসের সঙ্গে তাঁরা পাল্টা আক্রমণ মোকাবিলা করতে থাকেন। দুই পক্ষে প্রচণ্ড যুদ্ধের একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ছোড়া একটি শেল বিস্ফোরিত হয় সাইদুল হকের পাশে। বিস্ফোরিত শেলের কয়েকটি ছোট-বড় স্প্লিন্টার আঘাত করে তাঁর শরীরে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।

স্প্লিন্টারের আঘাতে সাইদুল হকের বাঁ পায়ের বিরাট অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একটু পর সহযোদ্ধারা রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। তখনো তাঁর জ্ঞান ছিল। এরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সহযোদ্ধারা তাঁকে ফিল্ড চিকিত্সাকেন্দ্রে পাঠান। প্রাথমিক চিকিত্সা দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয় আগরতলায়। সেখানে চিকিত্সা চলা অবস্থায় তাঁর অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হেলিকপ্টারে পাঠানো হয় ভারতের উত্তর প্রদেশে। এখানে চিকিত্সা চলাকালে দেশ স্বাধীন হয়ে যায়।

সাইদুল হক চাকরি করতেন ইপিআরে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন সিলেট ইপিআর সেক্টরের অধীনে। তাঁর পদবি ছিল নায়েক। তিনি তখন তাঁর উইংয়ে (বর্তমানে ব্যাটালিয়ন) কর্মরত একজন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার দেহরক্ষী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধে যোগ দেন। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে যান। পরে তিনি নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধীনে যুদ্ধ করেন। তাঁকে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কসবাসহ আরও কয়েকটি জায়গায় তিনি সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করেন।

বিজ্ঞাপন

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান