default-image

একসঙ্গে অনেক অস্ত্রের গর্জন। চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। তার ভেতর থেকেই ভেসে আসছে আর্তনাদ আর চিত্কারের শব্দ। শত্রুপক্ষের বেশির ভাগ লোকই নিহত। দু-তিনজন কোনোমতে জানে বেঁচে গেছে। তারা পালানোর পথ খুঁজছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা তা হতে দিলেন না। শেষ পর্যন্ত একজন শত্রুও প্রাণে বাঁচতে পারল না।

এ ঘটনা ঘটে ১৯৭১ সালের ৮ বা ৯ নভেম্বর। ভোরে। ফেনী জেলার বিলোনিয়ায়। সেখান থেকে রেললাইনের পাশ দিয়ে একটা কাঁচা রাস্তা চলে গেছে ফেনী পর্যন্ত। চিথলিয়া-পরশুরামের মাঝামাঝি এ রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় আগের রাতে প্রতিরক্ষা অবস্থান নিয়েছেন রমজান আলীসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা।

দেখতে দেখতে ভোর হয়ে গেল। সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল চারদিক। মুক্তিযোদ্ধারা বাংকারে বসে বাইরের দিকে নজর রাখছেন। চারদিকে সুনসান নীরবতা। সাড়াশব্দ নেই। ঘড়ির কাঁটা এক, দুই, তিন করে ঘুরতে লাগল। এভাবে কেটে গেল বেশ কিছু সময়। হঠাত্ চিথলিয়ার দিক থেকে একটা অস্পষ্ট আওয়াজ ভেসে এল। কিছু সময় পর দেখা গেল, ওদিক থেকে রেলের একটি ট্রলি এগিয়ে আসছে। আস্তে আস্তে ট্রলিটি আরও কাছে এগিয়ে এল। মুক্তিযোদ্ধারা দেখতে পেলেন, ট্রলিতে বসে আছে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা।

বিজ্ঞাপন

তারপর একসঙ্গে অস্ত্রের গর্জন। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে ট্রলিটি ধ্বংস হয়ে গেল। গোলাগুলির শব্দ শুনে চিথলিয়া ও পরশুরাম থেকে শত্রুপক্ষ এগিয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালাল। পাকিস্তানি সেনাদের এই আক্রমণে রমজান আলীর সহযোদ্ধা এয়ার আহমদ শহীদ হন। তাঁকে হারিয়ে কিছুটা মুহ্যমান হয়ে পড়লেও মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুর হামলার প্রত্যুত্তর দিচ্ছিলেন। শত্রুরা তাঁদের ওপর একের পর এক আক্রমণ চালাচ্ছিল।

সারা দিন এখানে যুদ্ধ চলে। শত্রুরা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে বৃষ্টির মতো আর্টিলারি শেলিং করে। মুক্তিযোদ্ধারা সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে রমজান আলী আহত হন। সহযোদ্ধারা তাঁকে দ্রুত ফিল্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিত্সকেরা রমজান আলীকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু ওই দিন রাতেই তিনি মারা যান। তাঁর বাড়ি ছিল ওই এলাকাতেই। পরদিন কয়েকজন সহযোদ্ধা রমজান আলীর লাশ তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান। নিজ গ্রামেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

বিজ্ঞাপন

রমজান আলী ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে আক্রান্ত হওয়ার পর সেখান থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ২ নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টর এলাকার মির্জানগর, কাউতলী, বিলোনিয়া, মুন্সিরহাট, সলিয়াদীঘিসহ কয়েকটি জায়গায় যুদ্ধে অংশ নেন।