default-image

অন্ধকারে খালি চোখে দূরে কিছু দেখা যায় না। শেষ রাত। ঝিঁঝি পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। চা-বাগানের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। মো. হায়দার আলীসহ পরিশ্রান্ত মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্পে ঘুমিয়ে আছেন। কয়েকজন সহযোদ্ধা সতর্ক প্রহরায়। এ সময় গোলাগুলির শব্দে ভেঙে পড়ল রাতের নিস্তব্ধতা। মুক্তিযোদ্ধারা জেগে জানতে পারলেন, পাকিস্তানি সেনারা পেছন দিক থেকে তাঁদের আক্রমণ করেছে। আকস্মিক এই আক্রমণে তাঁরা কিছুটা হকচকিত। কিন্তু আর ভাবার সময় নেই। যে যেভাবে পারলেন দ্রুত অবস্থান নিয়ে আক্রমণ শুরু করলেন। মুহূর্তেই শুরু হয়ে গেল প্রচণ্ড যুদ্ধ। এ ঘটনা ১৯৭১ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সিলেটের তেলিয়াপাড়ার একটি চা-বাগানের।

মো. হায়দার আলীসহ তাঁর সহযোদ্ধারা সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করেও ব্যর্থ হন। এক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের ক্যাম্প পাকিস্তানি সেনারা দখল করে। ১৬ জন যোদ্ধা শহীদ হন। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর জন্য অধিনায়ক তাঁদের পশ্চাদপসরণের নির্দেশ দেন। সে সময় পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের অবস্থানের ওপর বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ করছে। তাঁরা কাভারিং ফায়ারের আড়ালে পেছনে যান। কেউ ক্রল করে, কেউ মাথা নিচু করে দৌড়ে।

বিজ্ঞাপন

নিরাপদ স্থানে সমবেত হওয়ার পর অধিনায়ক তাঁদের যেকোনো মূল্যে ওই ক্যাম্প দখল করতে নির্দেশ দেন। মো. হায়দার আলী ও তাঁর সহযোদ্ধারা নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে পরদিন ভোর চারটায় পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ করেন। শুরু হয় আবার প্রচণ্ড যুদ্ধ। একটি টিলার ওপর ছিল পাকিস্তানি সেনাদের মেশিনগান পোস্ট। তারা সেখান থেকে গুলি করছিল। এর জন্য মুক্তিযোদ্ধারা সামনে এগোতে পারছিলেন না। মো. হায়দার আলী পাহাড়ি নালার মধ্য দিয়ে ক্রল করে একাই এগিয়ে যান সেদিকে। পাকিস্তানি সেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি সেই মেশিনগান পোস্টে দুটি গ্রেনেড চার্জ করেন। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে গুলি বন্ধ হয়ে যায়। হায়দার আলী ক্রল করে কাছে গিয়ে দেখেন, চার পাকিস্তানি সেনা আহত অবস্থায় পড়ে আছে। তিনি এসএমজি ব্রাশফায়ারে তাদের হত্যা করেন। মেশিনগান পোস্ট ধ্বংস হওয়ায় তাঁদের পক্ষে ওই ক্যাম্প পুনর্দখল করা সহজ হয়।

মো. হায়দার আলী ১৯৭১ সালে ইপিআরে চাকরি করতেন। কর্মরত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা বিওপিতে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন। পরে ভারতে যান। সেখানে তাঁকে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি ৩ নম্বর সেক্টর ও এস ফোর্সের অধীনে বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করেন।

১৯৯০ সালে বিডিআরের চাকরি থেকে অবসর নেন।

বিজ্ঞাপন