default-image

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে একদল মুক্তিযোদ্ধা সমবেত হন আশুগঞ্জ ও ভৈরবে। মেঘনা নদীর এক পারে ভৈরব, আরেক পারে আশুগঞ্জ। একটি উপদলের নেতৃত্বে ছিলেন মো. নূরুল হক। তাদের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করা। এ জন্য মো. নূরুল হক সহযোদ্ধাদের নিয়ে প্রতিরক্ষা অবস্থান নেন আশুগঞ্জে। তাঁদের সঙ্গে ছিল আরও দু-তিনটি উপদল।

১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত আশুগঞ্জ ও ভৈরব মুক্ত ছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আশুগঞ্জ-ভৈরব দখলের জন্য ওই দিন থেকে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। মো. নূরুল হক ও তাঁর সহযোদ্ধারা ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হন। বিক্রমের সঙ্গে তাঁরা পাকিস্তানি আক্রমণ প্রতিহত করেন। তাঁদের পাল্টা আক্রমণে নদীপথে আসা পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে যায়।

কিন্তু এই সফলতা মো. নূরুল হকরা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেননি। কিছুক্ষণ পর থেকে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ তাঁদের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর কয়েকটি যুদ্ধবিমান তাঁদের ওপর বোমাবর্ষণ শুরু করে। এ আক্রমণ মোকাবিলা করার মতো অস্ত্র তাঁদের কাছে ছিল না। একনাগাড়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে বিমান আক্রমণ চলে। এ সময় তাঁর দলসহ অন্যান্য দলের মুক্তিযোদ্ধারা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েন।

বিজ্ঞাপন

এতে মো. নূরুল হক দমে যাননি। বিমান আক্রমণ শেষ হলে সহযোদ্ধাদের পুনরায় সংগঠিত করে আবার তিনি আগের স্থানে অবস্থান নেন। পরদিন ভোরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁদের অবস্থানের অদূরে হেলিকপ্টারের সাহায্যে কমান্ডো নামায়। তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে তাঁদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। একপর্যায়ে পাকিস্তানিরা তাঁদের চারদিক দিয়ে প্রায় ঘেরাও করে ফেলে। তখন দুই পক্ষে মুখোমুখি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

পাকিস্তানিদের জল-স্থল-আকাশপথের ত্রিমুখী সাঁড়াশি আক্রমণে মো. নূরুল হকরা শেষ পর্যন্ত সেখানে টিকতে পারেননি। বীরত্ব ও সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করেও তাঁরা ব্যর্থ হন। ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে তাঁদের পিছু হটে যেতে হয়। যুদ্ধে আহত হন তাঁর অধিনায়ক এ এস এম নাসিমসহ অনেক সহযোদ্ধা। শহীদ হন কয়েকজন।

মো. নূরুল হক চাকরি করতেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। এর অবস্থান ছিল জয়দেবপুরে। তখন তাঁর পদবি ছিল সুবেদার মেজর। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিদ্রোহ করে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। জয়দেবপুর থেকে সহযোদ্ধাদের নিয়ে তিনি টাঙ্গাইল হয়ে ময়মনসিংহে সমবেত হন। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার পর তিনি ৩ নম্বর সেক্টরে, পরে এস ফোর্সের অধীনে নানা দায়িত্ব পালন করেন।

বিজ্ঞাপন

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান