default-image

ক্ষিপ্রগতিতে মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে যাচ্ছেন সামনে। তাঁরা কয়েকটি দলে বিভক্ত। একটি দলের (চার্লি কোম্পানি) নেতৃত্বে মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া। তাঁদের লক্ষ্য, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাহবাজপুর সেতু অনতিবিলম্বে দখল করা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত সরাইল উপজেলার পূর্ব দিকে শাহবাজপুর।

মুক্তিযোদ্ধা সব মিলিয়ে এক ব্যাটালিয়ন শক্তি। এই অভিযানে আছেন এস ফোর্সের অধিনায়ক মেজর কে এম সফিউল্লাহ (বীর উত্তম, পরে মেজর জেনারেল ও সেনাপ্রধান)। তাঁর সঙ্গে আছে ক্ষুদ্র একটি দল। সফিউল্লাহ যখন শাহবাজপুরের অদূরে ইসলামপুরে পৌঁছালেন, তখন একটি দুর্ঘটনা ঘটে। হঠাত্ সেখানে হাজির হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুটি মিলিটারি ট্রাক। তাতে ৩০ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের ১৫-১৬ জন সেনা।

মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া তখন তাঁর দল নিয়ে কিছুটা সামনে। ইসলামপুরে পাকিস্তানি সেনাদের উপস্থিতি ছিল একেবারে আশাতীত।

কে এম সফিউল্লাহ তাত্ক্ষণিক পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তারা হাত উঁচু করে ট্রাক থেকে নেমেই গুলি শুরু করে। এক পাকিস্তানি সেনা (সুবেদার) তাঁর ওপর চড়াও হয় এবং অগ্রসরমাণ নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার দলের ওপর আক্রমণ চালায়।

বিজ্ঞাপন

সে সময় সেখানে বাসে করে হাজির হলো আরও কিছু পাকিস্তানি সেনা। তখন প্রচণ্ড লড়াই শুরু হয়ে গেল। ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক এ এস এম নাসিম গুরুতর আহত হলেন। আক্রমণের তীব্রতায় মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা বিশৃঙ্খল। তাঁর দলের চারটি প্লাটুনের মধ্যে অক্ষত শুধু একটি প্লাটুন।

মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বিচলিত হলেন না। মাথা ঠান্ডা রেখে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সতর্কতার সঙ্গে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন। অক্ষত প্লাটুন নিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন পাকিস্তানি সেনাদের ওপর। তাঁর সাহসিকতায় উজ্জীবিত হলেন সহযোদ্ধারা। শেষ পর্যন্ত প্রবল যুদ্ধের পর পর্যুদস্ত হয় সব পাকিস্তানি সেনা।

সেদিন মো. নজরুল ইসলামের সাহসিকতা ও বীরত্বে কে এম সফিউল্লাহ, এ এস এম নাসিমসহ অনেকের জীবন বেঁচে যায়। যুদ্ধে ২৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত ও ১৪ জন বন্দী হয়। মুক্তিবাহিনীর দুজন শহীদ ও ১১ জন আহত হন।

মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া ১৯৭১ সালে শিক্ষার্থী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি তাতে যোগ দেন। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে যান। পরে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় প্রথম বাংলাদেশ ওয়ার ফোর্সে। প্রশিক্ষণ শেষে অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধে আবার যুদ্ধে যোগ দেন।

মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেই থেকে যান। লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে অবসর নেন। বর্তমানে জাতীয় সংসদ সদস্য।

বিজ্ঞাপন

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান