default-image

১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথমার্ধে একদল মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা অপারেশন চালায় মোগলহাট রেললাইনে। নেতৃত্বে ছিলেন মো. দেলাওয়ার হোসেন। তাঁর বয়ান:

‘একটি অপারেশনের কথা আমার মনে পড়ছে। লালমনিরহাট থেকে মোগলহাটে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের জন্য প্রতিদিন সকালে ট্রেনে করে সৈন্য ও সেনা আসত। দিনটি ছিল যত দূর সম্ভব ১৫ সেপ্টেম্বর। ভোর পাঁচটায় ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে মোগলহাট রেললাইনের কাছে অবস্থান নিই।

‘রেললাইনের ওপর অ্যান্টিট্যাংক মাইন বসানো হয়। গ্যালাটিন ও পিইকে ঠিকমতো বসিয়ে দূরে সুইচ লাগিয়ে শত্রুট্রেন আসার অপেক্ষায় অবস্থান নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। ঠিক সময়েই ট্রেনটি সামনের কয়েকটি বগিতে বালু এবং অন্যান্য জিনিস ভর্তি করে আসে। পেছনের বগিতে ছিল পাকিস্তানি সেনারা।

‘আমাদের অ্যান্টিট্যাংক মাইনের আঘাতে ট্রেনের ইঞ্জিনসহ সামনের কয়েকটি বগি ধ্বংস হয়। পাকিস্তানি সেনারা সঙ্গে সঙ্গে তাদের অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আমাদের গোলাগুলির জবাব দিতে শুরু করে। তারা ট্রেন থেকে নেমে তিন দিক থেকে আমাদের ঘিরে ফেলে। অবস্থা বেগতিক দেখে মুক্তিযোদ্ধাদের আমি পেছনে সরে যেতে নির্দেশ দিই।

বিজ্ঞাপন

‘আমার কাছে একটা হালকা মেশিনগান ছিল। সেটা দিয়ে আমি শত্রুসেনাদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাই। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা পেছনে সরে যেতে সক্ষম হন। এই অপারেশনে দুজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও চারজন আহত হন। আমিও বাঁ হাতে সামান্য আঘাত পাই। শত্রুদের পাঁচজন নিহত ও অনেকে আহত হয়।

‘এই অপারেশনের খবরটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয় এবং এর জন্যই বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীকালে আমাকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করে।’

মো. দেলাওয়ার হোসেন চাকরি করতেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অর্ডন্যান্স কোরে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। পদবি ছিল ক্যাপ্টেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আগস্ট মাসে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধ করেন ৬ নম্বর সেক্টরে। প্রথমে কিছুদিন সেক্টর হেডকোয়ার্টার্সে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে মোগলহাট সাবসেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব পান। এই সাবসেক্টরের আওতাধীন এলাকা ছিল লালমনিরহাট জেলার দক্ষিণ অংশ। লালমনিরহাট সদর, রায়গঞ্জ, কাউনিয়া, আদিতমারিসহ বিভিন্ন জায়গায় ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান।

মো. দেলাওয়ার হোসেন অনেক যুদ্ধ ও গেরিলা অপারেশনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাগেশ্বরীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ, কম্বলপুর সেতু অপারেশন, কুলাহাট পাকিস্তানি সেনা অবস্থানে হামলা ও পাটেশ্বরীতে পাকিস্তানি গোলন্দাজ অবস্থানে আকস্মিক আক্রমণ প্রভৃতি।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন