default-image

মুক্তিবাহিনীর ২ নম্বর সেক্টরের ঢাকার গেরিলাদলের সদস্য ছিলেন মো. তৈয়ব আলী। ঢাকা মহানগরের মাদারটেক ও আশপাশে বেশ কয়েকটি গেরিলা অপারেশন করে সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এর মধ্যে একটি ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গানবোটে আক্রমণ।

আমাদের সংগ্রাম চলবেই বইয়ে মো. তৈয়ব আলীর একটি অসম্পূর্ণ বয়ান আছে। তাতে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে আমি মাছ ধরতাম। ঢাকা শহরে আম, কমলা, লিচু, ফল ফেরি করে বিক্রি করতাম। এককথায় ফেরিওয়ালা। মে মাসের শেষে। হাতীমারা ক্যাম্পে সন্ধ্যাবেলা পৌঁছালাম। দুই দিন পর আমাদের লাইন করে দাঁড় করানো হলো। সুবেদার বললেন, ঢাকা টাউন বা ঢাকার আশপাশ থেকে কেউ এসেছেন কি না, হাত তোলেন। আমরা দেড় শ জনের মতো ছিলাম। তিনজনই মাত্র হাত তুললাম।’

মো. তৈয়ব আলীর এর পরের বয়ান ওই বইয়ে ছাপা হয়নি। তবে মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়ার জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা বইয়ে তাঁর সম্পর্কে কিছু তথ্য আছে। তিনি লিখেছেন, ‘ছেলেটির নাম তৈয়ব আলী। এ ছেলেটি ক্যাপ্টেন হায়দারের কাছে ঢাকার আঞ্চলিক ভাষায় তাকে একটি এলএমজি দেওয়ার জন্য রীতিমতো অনুনয় করতে লাগল। পাশে আমরা অনেকেই দাঁড়িয়ে। এলএমজি তখন একটি দুষ্প্রাপ্য অস্ত্র। সাধারণত গেরিলাদলকে এ অস্ত্র দেওয়া হয় না। তৈয়ব আলী এমন সরলভাবে ক্যাপ্টেন হায়দারের কাছে আকুতি-মিনতি করতে লাগল, যেন তিনি ইচ্ছে করলেই তাকে সেটি দিতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

‘হায়দার মুচকি মুচকি হাসছেন। বললেন, “যুদ্ধে আগে কিছু করো। এলএমজি পাবে।” কিছুদিন পর তৈয়ব আলী গামছায় বেঁধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মিলিটারি পুলিশের এক ক্যাপ্টেনকে হত্যা করে তার ব্যাজেজ অব র‍্যাংক, সাদা বেল্ট, লাল টুপি, বুট, পাউচসহ পিস্তল এনে ক্যাপ্টেন হায়দারের কাছে উপস্থাপন করল। তারপর বলল, “স্যার, যুদ্ধ কইরা আইছি, এইবার এলএমজি দ্যান।”

‘তারও বেশ কিছুদিন পরের কথা। হায়দার তৈয়ব আলীকে জিজ্ঞেস করলেন, “বল তো ২ ইঞ্চি মর্টারের গোলা কত দূর যায়?” তৈয়ব আলী সামনের পাহাড়ের নিচে ছোট একটি গাছ দেখিয়ে বলল, “স্যার, ওদ্দুর যাইব।” চার শ-সাড়ে চার শ গজ। হায়দার বললেন, “যদি বলতে পারো কীভাবে মারলে অত দূর গোলা যাবে, তবে তোমাকে মর্টার দিব।” তৈয়ব আলী বাম হাত আড়াআড়ি করে রেখে ডান হাত তার ওপর বাঁকা করে বলল, “এই রকম স্যার। মাঝামাঝি।”

‘অপূর্ব! ঠিক ৪৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল। এরপর থিয়োরি অব স্মল আর্মস ফায়ার, হাই ট্রাজেকটরি উইপন ট্রেনিং, ক্যালকুলাস পড়ার কোনো প্রয়োজনই রইল না।’

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন