default-image

মো. জালাল উদ্দীনসহ কয়েকজন নৌ-কমান্ডো বাংলাদেশের ভেতরে গোপন আশ্রয়স্থলে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। এ সময় সেই আশ্রয়স্থলের অদূরে বয়ে যাওয়া নদী থেকে ভেসে এল ইঞ্জিনের ভটভট শব্দ। গ্রামবাসী কয়েকজন দৌড়ে এসে খবর দিলেন, নদীতে দুটি জাহাজ আসতে দেখা যাচ্ছে। নৌ-কমান্ডোদের বুঝতে বাকি থাকল না, ওগুলো আর কিছু নয় পাকিস্তানি গানবোট। খাবার রেখে তাঁরা উঠে পড়লেন। বেশ ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত তাঁরা। শক্তিবলও সামান্য। দলটি মাত্র ১২ জনের। অস্ত্র বলতে একটি এলএমজি, পাঁচটি এসএমজি ও ছয়টি এসএলআর। তার পরও তাঁরা সাহসী এক সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানি ওই গানবোট আক্রমণ চালানোর। এরপর তাঁরা দ্রুত প্রস্তুত হয়ে গ্রামবাসীকে বললেন নিরাপদ অবস্থানে থাকতে। নৌ-কমান্ডোরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে নদীর তীরে বাঁধে অবস্থান নিলেন। গানবোট দুটির প্রথমটি বেশ এগিয়ে। দ্বিতীয়টি কিছুটা দূরে। প্রথম গানবোটটি নৌ-কমান্ডোদের নাগালের মধ্যে আসামাত্র গর্জে উঠল তাঁদের সবার অস্ত্র। গানবোটের সামনের গানার গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ল। আহত হলো আরও কয়েকজন। অক্ষত নৌসেনারা ছোটাছুটি করতে থাকল। ভীতসন্ত্রস্ত ক্যাপ্টেন গানবোটের গতি বাড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে পালিয়ে গেল। দ্বিতীয় গানবোট থেকে গোলাবর্ষণ হতে লাগল। নৌ-কমান্ডোরা অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে সেই আক্রমণ অনেকক্ষণ ধরে মোকাবিলা করলেন। মো. জালাল উদ্দীন এ যুদ্ধে অসীম সাহস ও রণনৈপুণ্য দেখান। এ ঘটনা ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের। ঘটেছিল হরিনগরে।

বিজ্ঞাপন

হরিনগর সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানার অন্তর্গত। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা। অপারেশন জ্যাকপটের আওতায় মংলা ও হিরণ পয়েন্টে নৌ-অপারেশনে অংশ নেওয়ার জন্য আগস্টে ৬০ জন নৌ-কমান্ডো ভারত থেকে কয়রা থানার বেদকাশীতে আসেন। সেখান থেকে ১২ জন নৌ-কমান্ডো হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বে হিরণ পয়েন্টে অভিযানের জন্য রওনা হন। এই দলে ছিলেন মো. জালাল উদ্দীন। তাঁদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দীন (পরে মেজর)। তিনি তাঁদের হিরণ পয়েন্টে না পাঠিয়ে বরিশালের রাজাপুরে নিয়ে যান। ফলে অপারেশন জ্যাকপটের আওতায় হিরণ পয়েন্ট অভিযান ব্যর্থ হয়। জিয়াউদ্দীন নৌ-কমান্ডো দলকে রাজাপুরে নিষ্ক্রিয়ভাবে বসিয়ে রাখেন। এতে নৌ-কমান্ডোদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। বিশেষত, মো. জালাল উদ্দীন দলনেতাকে কয়েকবার এভাবে সময় নষ্ট না করে কিছু একটা করার জন্য বলেন। এরপর সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে একদিন তাঁরা যুদ্ধের সরঞ্জাম ও নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কোনো পথপ্রদর্শক ছাড়াই ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। বহু কষ্টে তাঁরা সীমান্তবর্তী হরিনগরে পৌঁছান। ১৮ সেপ্টেম্বর ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত নৌ-কমান্ডোরা শিকারি পচাব্দী গাজীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। পচাব্দী গাজীর বাড়ির পাশ দিয়েই ছিল নদী। ওই নদীপথেই পাকিস্তানি গানবোট তাদের কৈখালী বিওপিসহ অন্যান্য ঘাঁটিতে রসদ ও রেশনসামগ্রী পৌঁছে দিত। সেদিন দুটি পাকিস্তানি গানবোট ওই এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল। তখন নৌ-কমান্ডোরা ওই গানবোটে আক্রমণ করেন।

মো. জালাল উদ্দীন পাকিস্তানি নৌবাহিনীতে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রামে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যোগ দেন যুদ্ধে। পরে ভারতে যান। মে মাসে তাঁকে মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডো দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বেশ কয়েকটি অপারেশনে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘অপারেশন হটপ্যান্টস’ অভিযানেও (৭-১০ ডিসেম্বর) তিনি অংশ নেন। ১০ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর বিমান ভুলক্রমে তাঁদের গানবোটে বোমা ফেলে। এতে তাঁদের গানবোট ধ্বংস হয়ে যায়। তিনি সামান্য আহত হন।

বিজ্ঞাপন