default-image

কুমিল্লা জেলার সদর উপজেলার পাঁচথুড়ি ইউনিয়নের দুটি গ্রাম আমড়াতলী ও কৃষ্ণপুর। অবস্থান গোমতী নদীর উত্তর পারে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। ওপারে ভারতের মতিনগর ও কোনাবন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মতিনগরে ছিল মুক্তিবাহিনীর ২ নম্বর সেক্টরের একটি সাবসেক্টর। ওই ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই সীমান্ত অতিক্রম করে আমড়াতলী-কৃষ্ণপুর গ্রামে এসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর টহলদলের ওপর আক্রমণ চালাতেন।

১৯৭১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। সকালে মতিনগর সাবসেক্টরে অবস্থানরত মোহাম্মেদ দিদারুল আলম খবর পান, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি দল আমড়াতলী-কৃষ্ণপুরে এসেছে। তাদের সঙ্গে আছে রাজাকার বাহিনী। মতিনগরে তখন মুক্তিযোদ্ধা ১০০ জনের মতো। তাঁদের মধ্যে অল্প কয়েকজন পেশাদার। বাকি সবাই স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তার পরও মোহাম্মেদ দিদারুল আলম দমে যাননি। স্বল্প শক্তি নিয়েই তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন।

তাঁর নির্দেশে সহযোদ্ধারা দ্রুত তৈরি হলেন এবং সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালালেন। তখন সকাল প্রায় ১০টা। আকস্মিক আক্রমণে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা হকচকিত। সেটা অবশ্য কিছু সময়ের জন্য। তারা যে যেভাবে পারল, পজিশন নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করল। মুক্তিযোদ্ধারা মোহাম্মেদ দিদারুল আলমের নেতৃত্বে সাহসের সঙ্গে পাল্টা আক্রমণ মোকাবিলা করতে থাকলেন।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধ চলল সারা দিন। সন্ধ্যার পর মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্তের ওপারে চলে গেলেন। কারণ, তাঁদের গোলাগুলি প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। এ জন্য বাধ্য হয়েই তাঁরা পশ্চাদপসরণ করেন। সেদিন যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কয়েকজন নিহত ও অনেকে আহত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ হতাহত হননি।

পাকিস্তানি সেনারা ফিরে যাওয়ার সময় রাতে পাশের একটি গ্রামে হামলা চালায়। গ্রামে কেউ ছিল না। তবে একটি বাড়িতে অনেক শরণার্থী ভারতে যাওয়ার জন্য আশ্রয় নিয়েছিল। সেনাদের নির্বিচার গুলিতে প্রায় ৪০-৪২ জন নিরপরাধ নারী-পুরুষ শরণার্থী শহীদ হন।

মোহাম্মেদ দিদারুল আলম চাকরি করতেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে। ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। তখন তাঁর পদবি ছিল লেফটেন্যান্ট। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকা থেকে পালিয়ে চাঁদপুরে গিয়ে স্থানীয় প্রতিরোধযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন। চাঁদপুর ও লাকসামের কাছে বাগমারাসহ বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেন।

পরে ভারতে পুনঃসংগঠিত হওয়ার পর অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত মোহাম্মেদ দিদারুল আলম ২ নম্বর সেক্টরের মতিনগর সাবসেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মুক্তিবাহিনীর প্রথম গোলন্দাজ দল ‘মুজিব ব্যাটারি’তে অন্তর্ভুক্ত হন। অনেক গেরিলা এবং খণ্ডযুদ্ধ, অ্যামবুুশ, ডিমলিশন, আর্টিলারি যুদ্ধ তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে কুমিল্লা জেলার কোটেশ্বর ও চট্টগ্রাম জেলার নাজিরহাটের যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য।

বিজ্ঞাপন

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান