default-image

রাস্তায় স্টেনগান হাতে সতর্ক প্রহরায় মোহাম্মদ খোরশেদ আলম। অদূরে একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা পিকআপ ভ্যান। তাঁর সহযোদ্ধারা নিঃশব্দে তাতে লিমপেট মাইন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র তুলছেন। আধাআধি তোলা হয়েছে, এ সময় মোহাম্মদ খোরশেদ আলম দেখতে পেলেন কাছেই এক তরুণ পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে কী যেন করছে। তরুণটি রাজাকার না মুক্তিবাহিনীর সদস্য, এই দুর্ভাবনায় পড়ে গেলেন তিনি। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেন, যদি রাজাকার হয়, তাহলে পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ওই তরুণ তাঁর স্টেনগানের গুলির হাত থেকে বাঁচতে পারবে না। নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে লাগলেন তিনি। এই অবস্থার মুখে ওই তরুণ দিল চম্পট। অনুসরণ করেও ধরতে পারলেন না তাকে।

এ ঘটনা চট্টগ্রাম শহরের। ঘটেছিল ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। মোহাম্মদ খোরশেদ আলমসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা (মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডো) তখন গোপনে চট্টগ্রাম এসেছিলেন বন্দরে অপারেশন করার জন্য। সীতাকুণ্ডে রাখা ছিল তাঁদের মাইন ও অন্য অস্ত্রশস্ত্র। সে দিন মোহাম্মদ খোরশেদ আলমসহ কয়েকজন সীতাকুণ্ড থেকে চট্টগ্রাম শহরে সেগুলো নেওয়ার জন্য পিকআপে তুলছিলেন। বিপদের মুখে মোহাম্মদ খোরশেদ আলম সহযোদ্ধাদের সঙ্গে পরামর্শ করে পিকআপ নিয়ে সেখান থেকে দ্রুত সরে পড়েন। বড় রাস্তায় এসে তরিতরকারি (বরবটি, ঝিঙে ইত্যাদি) কিনে সেগুলো দিয়ে ঢেকে দেন মাইন ও অস্ত্রগুলো। গাড়ি ছেড়ে দিলেই শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। পরিস্থিতি তাঁদের অনুকূলে আসে। নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে তাঁরা শেষ পর্যন্ত নিরাপদেই শহরের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যান।

বিজ্ঞাপন

১৫ আগস্ট শেষ রাতে (তখন ঘড়ির কাঁটা অনুসারে ১৬ আগস্ট) তাঁরা চট্টগ্রাম বন্দরে সফলভাবে অপারেশন করেন। তাঁদের অপারেশনে কয়েকটি জাহাজ, বার্জ, গানবোট ও পন্টুন সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস এবং কয়েকটি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ছিল জাহাজ এমভি আল আব্বাস, এমভি হরমুজ, বার্জ ওরিয়েন্ট, দুটি গানবোট ও দু-তিনটি পন্টুন। এ ছাড়া ছোট কয়েকটি বার্জ সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়। অপারেশনে অংশ নেন ৩৭ জন। নৌ-কমান্ডোদের বেশির ভাগই পানিতে নেমে সাঁতরে নির্দিষ্ট টার্গেটে গিয়ে জায়গামতো মাইন সংযুক্ত করেন। কয়েকজন তীর থেকে একটু দূরে প্রহরায় থাকেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দলনেতা আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী (বীর উত্তম-বীর বিক্রম) এবং মোহাম্মদ খোরশেদ আলমসহ কয়েকজন।

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তাতে। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে যাওয়ার পর মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডো দলে যোগ দেন তিনি।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন