default-image

ভোর থেকেই শুরু হয়েছে প্রচণ্ড যুদ্ধ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তিবাহিনীর অবস্থানে আক্রমণ করেছে। মুক্তিবাহিনীর অগ্রবর্তী দল পাকিস্তানি সেনাদের মোকাবিলা করছে প্রাণপণে। এ সময় খবর এল, অগ্রবর্তী দলের গোলাবারুদ প্রায় শেষ। সেখানে দ্রুত গোলাবারুদ পৌঁছে দিতে না পারলে তাঁদের বেশির ভাগই মারা পড়বেন। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অব্যাহত আক্রমণ ও প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে সেখানে গোলাবারুদ নিয়ে যাওয়াটা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ একটা ব্যাপার। এই কঠিন কাজের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিলেন মজিবুর রহমান। গোলাবারুদভর্তি একটি গাড়ি নিয়ে তিনি রওনা হলেন মুক্তিবাহিনীর অগ্রবর্তী দলের অবস্থানের উদ্দেশে। তাঁর সঙ্গে মাত্র একজন সঙ্গী। অগ্রবর্তী অবস্থানে গিয়ে প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে কয়েকটি বাংকারে পৌঁছে দিলেন গোলাবারুদ। শেষবার একটি মেশিনগান পোস্টে গিয়ে দেখেন, গানম্যান গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন। মেশিনগানের পাশেই পড়ে আছে তাঁর নিথর দেহ। রক্তে ভেসে গেছে জায়গাটা। সেখানকার সহযোদ্ধা দুজন নেই। তাঁরা মেশিনগানের লক খুলে তা অকেজো অবস্থায় রেখে চলে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

মজিবুর রহমান তাঁর সঙ্গীকে বললেন পাশের বাংকার থেকে একটি লক আনতে। তারপর তিনি নিজেই অবস্থান নিলেন সেই বাংকারে। সঙ্গী ফিরে আসছেন না দেখে আবার উঠে নিজেই গেলেন সেখানে। সঙ্গী ও লকসহ এসে অচল সেই মেশিনগান সচল করলেন। আর ঠিক তখনই গুলি করতে করতে বাংকারের কাছাকাছি এসে পড়ল একদল পাকিস্তানি সেনা। চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হলেন তাঁর সঙ্গী। ক্ষিপ্রগতিতে মেশিনগান থেকে গুলি ছোড়া শুরু করলেন তিনি। গুলিতে হতাহত হলো বেশ কজন পাকিস্তানি সেনা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল মেশিনগানের গুলি। মেশিনগানের শূন্য বেল্টে গুলি ভরার জন্য প্রয়োজন হয় কমপক্ষে দুজন সাহায্যকারীর। তাঁর কাছে তখন একজন সাহায্যকারীও নেই। এদিকে পাকিস্তানি সেনারা একদম কাছে এসে পড়েছে। এ সময় পেছনে থাকা একজন সহযোদ্ধা তাঁকে বারবার পেছনে চলে যাওয়ার কথা বলতে থাকেন। তখন মজিবুর রহমান ওই সহযোদ্ধাকে বললেন, ‘মজিবুর রহমান পিছু হটতে জানে না।’ এরপর তিনি কোমরের বেল্ট থেকে পিস্তল বের করে গুলি করতে থাকেন। একসময় তাঁর পিস্তলের গুলিও শেষ হয়ে যায়। এরপর খালি হাতেই ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন এক পাকিস্তানি সেনার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের এক ঝাঁক গুলি এসে বিদ্ধ হয় তাঁর দেহে। ঝাঁঝরা হয়ে যায় তাঁর বুক।

এ ঘটনা ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিলের। ঘটেছিল যশোরের শার্শা উপজেলার কাগজপুকুরে। মুক্তিযোদ্ধাদের দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের সদর দপ্তর ছিল কাগজপুকুরের পার্শ্ববর্তী বেনাপোলে। ২৩ এপ্রিল সকালে নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বেনাপোলে মুক্তিবাহিনীর দপ্তর পরিদর্শনে আসেন। সেখানে ব্রিটিশ এমপি ডগলাসম্যান তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। এর পরপরই পাকিস্তানি সেনারা সেখানে আক্রমণ শুরু করে। ২৩ ও ২৪ এপ্রিল বেনাপোল ও কাগজপুকুরে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। মুক্তিবাহিনীর মজিবুর রহমানসহ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে শহীদ হন।

মজিবুর রহমান ইপিআরে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন যশোর সেক্টরের অধীন চুয়াডাঙ্গা ৪ উইংয়ে। তখন তাঁর পদবি ছিল হাবিলদার। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে চুয়াডাঙ্গা ইপিআর উইংয়ের বাঙালি অধিনায়ক মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর (পরে লে. কর্নেল) নেতৃত্বে যুদ্ধে যোগ দেন।

বিজ্ঞাপন