default-image

প্রথমে বিকট একটি শব্দ। দুই থেকে তিন মিনিট পর আরেকটি। তারপর একসঙ্গে তিনটি। এরপর শুরু হলো খই ফোটার মতো বিস্ফোরণ। নৌবন্দর থেকে নদীর মোহনা পর্যন্ত এলাকার জলভাগে যেন মহাপ্রলয় শুরু হয়ে গেল। বিস্ফোরণের গগনবিদারী শব্দে বন্দরসংলগ্ন শহর কয়েকবার কেঁপে উঠল। সেই শব্দে বন্দর ও জাহাজের ডেকে থাকা পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল অস্থির ছোটাছুটি, হুলুস্থুল কাণ্ড। একটু পর একে একে ডুবতে থাকল মাইন লাগানো জাহাজ-বার্জগুলো। ডুবন্ত জাহাজের ডেক থেকে ভীতসন্ত্রস্ত পাকিস্তানি সেনা ও নাবিকেরা এলোমেলোভাবে গুলি চালাতে চালাতে লাফিয়ে পড়তে থাকল নদীতে। মুহূর্তে কী ঘটে গেল, এখন কী করা উচিত—ভেবে দেখার সময় নেই কারও। দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটি জাহাজ-বার্জ প্রচণ্ড শব্দ তুলে ঝাঁকুনি খেতে খেতে ডুবে গেল।

এ ঘটনা ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্টের খুব ভোরের। ঘটেছিল চাঁদপুর নৌবন্দরে।

১৫ আগস্টের গভীর রাত। চারদিক নিঝুম, নিস্তব্ধ। কোথাও জনমানুষের সাড়া নেই। সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। চাঁদপুর শহরের কাছে একটি বাড়ি। বাড়ির মালিক করিম খান। তাঁর বাড়িতে ১৩ আগস্ট রাত থেকে আত্মগোপন করে আছে মুক্তিবাহিনীর ২০ জনের একটি দল। তাঁদের সবাই নৌ-কমান্ডো। দলনেতার নাম বদিউল আলম। সময়মতো এ বাড়ি থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়লেন তাঁরা। প্রত্যেকের বুকে বাঁধা লিমপেট মাইন। কোমরে ড্যাগার। তাঁরা এগিয়ে চলেছেন মেঘনা-ডাকাতিয়া নদীর মোহনার দিকে।

বিজ্ঞাপন

তাঁদের টার্গেট ছয়টি জাহাজ, পন্টুন ও বার্জ। সেগুলো মাইন দিয়ে ধ্বংস করে দিতে হবে। দলনেতা বদিউল আলম ১৮ জনকে মোট ছয়টি দলে ভাগ করে প্রতিটি টার্গেটে আঘাত হানার জন্য তিনজনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। বাকি দুজন নদীর তীরে থাকবেন।

বদিউল আলমের নেতৃত্বে কমান্ডোরা যথাসময়ে নেমে পড়েন বন্দরসংলগ্ন নদীতে। বর্ষাকাল বলে মেঘনার মোহনার তখন ভয়ংকর রূপ। অথই পানি, প্রবল ঢেউ আর স্রোত। এর মধ্যে তাঁরা অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে সাঁতরে চলেছেন। অন্যদিকে পাকিস্তানি জাহাজ থেকে অনুসন্ধানী আলো চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে শত্রুর সন্ধান করছে। বিপজ্জনক এক অবস্থা। এর মধ্যেই দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিটি দল সফলতার সঙ্গে নির্দিষ্ট টার্গেটে মাইন লাগিয়ে ফিরে চলল নিরাপদ স্থানের দিকে। ৪৫ মিনিটের মধ্যেই বিস্ফোরিত হবে মাইনগুলো। এ সময় হঠাত্ দেখা দিল নতুন বিপদ। যেদিক দিয়ে তাঁরা ফিরে যাবেন, সেখানে নোঙর ফেলেছে রকেট স্টিমার সার্ভিসের জাহাজ ‘গাজী’। পাকিস্তানি সেনা ও গোলাবারুদ নিয়ে খুলনা থেকে এসেছে জাহাজটি। সেনারা সব জাহাজে। ডেকে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনাকে অস্ত্র হাতে পাহারারত অবস্থায় দেখা গেল। জাহাজটি অন্ধকারে প্রেতচ্ছায়ার মতো নদীর পাড় ঘেঁষে ভেসে আছে পানির ওপর। এই জাহাজ দেখে তাঁরা চমকে উঠলেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। যাওয়ার কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁরা। অল্পক্ষণের মধ্যেই মাইনের বিস্ফোরণ ঘটবে। রাতও প্রায় শেষ হয়ে আসছে। এ অবস্থায় প্রথম দলটি দ্রুত একটি বার্জের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। এই বার্জে মাইন লাগানো হয়নি। অন্যরাও তাঁদের মতোই সেখানে লুকিয়ে পড়লেন।

এই অপারেশনে মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডো বদিউল আলম সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দেন।

পাকিস্তানি নৌবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় ১৯৭১ সালে বদিউল আলম ফ্রান্সের তুল নৌঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। এই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার জন্য পাকিস্তান থেকে গিয়েছিলেন ৫৭ জন সাবমেরিন সেনা। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি। ৩০ মার্চ নয়জন বাঙালি সাবমেরিন সেনা পালিয়ে যান। পরে তাঁদের আটজন ভারতে আসেন। এরপর তাঁরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। বদিউল আলম পরে মংলা ও চালনা বন্দর অপারেশনে অংশ নেন।

বদিউল আলম স্বাধীনতার পর ব্রিটিশ হাইকমিশন ও পরে জনতা ব্যাংকে চাকরি করেন। অবসর নেন ২০০৪ সালে।

বিজ্ঞাপন