default-image

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তর্গত রাধানগর। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে সেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর কয়েক দিন যুদ্ধ হয়। রাধানগরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান ছিল বেশ শক্তিশালী। প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ছিল ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও টসি ব্যাটালিয়ন। তারা বেশ দুর্ধর্ষ প্রকৃতির ছিল। ২৭ নভেম্বর মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা এককভাবে রাধানগরে আক্রমণ করেন। তাঁরা সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করে রাধানগরের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান দখল করে নেন।

মুক্তিবাহিনীর একটি দলে আছেন নূরুল হক। ২৮ নভেম্বর সকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর্টিলারি গোলাবর্ষণের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ জায়গায় অবস্থান নিতে লাগলেন। এ সময় একটি গোলা এসে বিস্ফোরিত হলো নূরুল হকের পাশে। নিমেষে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেল নূরুল হকের পুরো দেহ। এ সময় তিনি তাঁর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট এস আই এম নূরুন্নবী খানের (বীর বিক্রম, পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল) পাশেই ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

নূরুন্নবী খান বীর বিক্রম তাঁর অপারেশন রাধানগর বইয়ে এদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, ‘২৮ নভেম্বর, ১৯৭১। সকাল ৭টা বেজে ১০ মিনিটের মতো হবে। চারদিক দিনের আলোয় উদ্ভাসিত। এ সময় আমি আমার প্রতিটি প্লাটুন এবং সেকশনকে পাকিস্তানি সেনাদের যেকোনো ধরনের প্রতিহামলা প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত করে নির্বাচিত কমান্ডপোস্ট এলাকায় অবস্থান করছিলাম। ৮টার দিকে পাকিস্তানি সেনাদের সেই প্রতীক্ষিত প্রতিহামলা শুরু হয়ে গেল। প্রথমেই প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ওরা ব্যাপক আকারে আমাদের অবস্থানের ওপর গোলা নিক্ষেপ করল। পাকিস্তানি সেনারা যেন দেখে দেখে গোলা নিক্ষেপ করছিল। কিন্তু আমাদের দখলীকৃত পাকিস্তানি সেনাদের বাংকারগুলো এতই মজবুত ছিল যে আর্টিলারি গোলা ক্ষতি করতে পারছিল না। হঠাত্ একটি গোলা এসে আমার কমান্ডপোস্টের বাঁশঝাড়টির প্রায় সবগুলো বাঁশই টুকরো টুকরো করে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলল। সিপাহী নূরুর (নূরুল হক) দেহটি টুকরো টুকরো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেল। গুম শব্দে মুহূর্তের মধ্যে আমি ড্রাইভ দিয়ে বাংকারে ঢুকে পড়েছিলাম। নূরু (নূরুল হক) তা করতে সময় পায়নি।’

নূরুল হক চাকরি করতেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে। ১৯৭০ সালে কর্মরত ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। নভেম্বরের শেষ দিকে তিনি ছুটি নিয়ে বাড়ি এসে বিয়ে করেন। এরপর ক্রমেই দেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকলে তিনি আর চাকরিতে যোগ দেননি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্ত্রীকে রেখে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধ করেন নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধীনে। ছাতক, গোয়াইনঘাটসহ কয়েকটি জায়গায় যুদ্ধ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন