default-image

নূরুল ইসলাম ভূঁইয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। যোগ দিয়েছিলেন ১৯৬৯ সালে। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসে ছুটি কাটিয়ে আবার যোগ দেন কর্মস্থলে। যেদিন কর্মস্থলে ফিরে যান, সেদিন মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই বাড়ির পার্শ্ববর্তী রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাঁকে বিদায় জানান। এরপর মা ছাড়া সবাই বাড়িতে ফিরে যান। মা নিষ্পলক চেয়ে থাকেন ছেলের গমনপথের দিকে। নূরুল ইসলামও বারবার পেছন ফিরে মাকে দেখতে থাকেন। তিনি দৃষ্টিসীমা থেকে অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত সেদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর মা।

নূরুল ইসলাম ভূঁইয়া কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার দিন কয়েক পরই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এর পর থেকে তাঁর আর খোঁজ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধে তিনি যোগ দিয়েছেন কি দেননি—তাঁর পরিবারের সদস্যরা সেটা জানতে পারেননি। স্বাধীনতার পর মা-বাবা ও ভাইবোনেরা তাঁর অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকেন। তারপর চার-পাঁচ মাস কেটে যায়। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তাঁর মা-বাবাসহ পরিবারের লোকজন। খোঁজ নিতে থাকেন তাঁরা। মা ও বড় ভাই যান কুমিল্লা সেনানিবাসে। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, নূরুল ইসলাম ভূঁইয়া মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে ২ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন। সালদা নদীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। ওই যুদ্ধে নূরুল ইসলাম ভূঁইয়া সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দেন। সহযোদ্ধারা তাঁকে সেখানেই সমাহিত করেন।

বিজ্ঞাপন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার অন্তর্গত সালদা নদী। এ নদীর পাশাপাশি কসবার বিভিন্ন জায়গায় ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান। ১৯৭১ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর কয়েকটি দল সালদা নদী ও কসবায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানে একযোগে হামলা চালায়। মুক্তিবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন কে ফোর্সের কমান্ডার খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম)। কয়েক দিন সেখানে যুদ্ধ চলে। এখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা বাংকারগুলো ছিল খুবই মজবুত। আর্টিলারির গোলাবর্ষণ করেও সেগুলো ধ্বংস করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক থেকে পাকিস্তানি সেনাদের অবরোধ করে সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। পাকিস্তানি সেনাদের পালানোর পথ ছিল রুদ্ধ। কিন্তু তাদের প্রতি বাংকারেই মজুদ ছিল বিপুল রসদ। সেগুলোর সাহায্যে তাদের পক্ষে অনেক দিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। পাকিস্তানি সেনারা সুরক্ষিত বাংকারে অবস্থান করে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকে। দুই পক্ষে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলা অবস্থায় ২১ বা ২২ অক্টোবর খালেদ মোশাররফ গোলার স্প্লিন্টারে আহত হন। কয়েক দিনের যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর কয়েকজন শহীদ হন। তাঁরা কেউ গুলিতে, কেউ গোলার স্প্লিন্টারের আঘাতে শহীদ হন। এ যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।