default-image

গভীর রাতে সীমান্ত অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলেন একদল মুক্তিযোদ্ধা। তাঁরা কয়েকটি দলে বিভক্ত। একটি দলে আছেন কে এম আবু বাকের। তিনিই তাঁদের দলনেতা। অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা পথ হারিয়ে ফেললেন। এর মধ্যে ভোর হলো। আবছা আলোয় বুঝতে পারলেন আঁকাবাঁকা পথে তাঁরা বেশি দূর এগোতে পারেননি। খুব সকালে বিশ্রাম নিচ্ছেন, এ সময় তাঁদের সামনে হঠাত্ হাজির হলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর টহলদল। একসঙ্গে এত মুক্তিযোদ্ধা দেখে পাকিস্তানি সেনাদের চক্ষু তো চড়কগাছ। মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ করার আগেই ভয় পেয়ে তারা আত্মসমর্পণ করল। এ ঘটনা ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ঘটেছিল ভানুগাছের কাছাকাছি।

ভানুগাছ মৌলভীবাজার জেলার অন্তর্গত। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বৃহত্তর সিলেটকে মুক্ত করার জন্য সীমান্ত এলাকা থেকে শমশেরনগর-মৌলভীবাজার ও সিলেট অক্ষরেখা ধরে এগিয়ে যেতে থাকে। ৩০ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে তাঁরা অভিযান শুরু করেন। কমলগঞ্জ হয়ে কেরামতনগর মুক্ত করার জন্য তাঁরা এগোতে থাকেন ভানুগাছের দিকে। কিন্তু পথ হারিয়ে ফেলায় মুক্তিযোদ্ধারা সময়মতো ভানুগাছে পৌঁছাতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন

কেরামতনগরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান ছিল বেশ শক্তিশালী। কে এম আবু বাকেরের নেতৃত্বাধীন দলের ওপর কেরামতনগরের আউট পোস্ট দখলের দায়িত্ব ছিল। তিনি তাঁর দল নিয়ে দিনের বেলাতেই সেখানে আক্রমণ চালান। পাকিস্তানি সেনারাও তাঁদের পাল্টা আক্রমণ করে। শুরু হয় দুই পক্ষে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা ও বীরত্বে হকচকিত পাকিস্তানি সেনারা একপর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। মুক্তিযোদ্ধারা সহজেই কেরামতনগর দখল করেন।

এই যুদ্ধে কে এম আবু বাকের কৌশলী ভূমিকা পালন করে পাকিস্তানি সেনাদের তাক লাগিয়ে দেন। তারা ভাবতেই পারেনি দিনের বেলায় মুক্তিযোদ্ধারা তাদের এভাবে আক্রমণ করবে। যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। মুক্তিবাহিনীর সাতজন আহত হন।

কে এম আবু বাকের ১৯৭১ সালে শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁকে প্রথমে বাংলাদেশ ওয়ার ফোর্সে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি জেড ফোর্সের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধীনে যুদ্ধ করেন। ধামাই চা-বাগান, সোনারুপা ও ফুলতলায় তাঁর উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন