বিজ্ঞাপন
default-image

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মে মাস থেকে পাকিস্তানের সামরিক সরকার বারবার প্রচার করছিল, বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। কোনো যুদ্ধ-পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি। বিদেশিরা যাতে এ প্রচারের ফাঁদে না পড়েন, সে জন্য মুক্তিবাহিনীর ক্র্যাক প্লাটুনের আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিনসহ চারজন ৯ জুন ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দুঃসাহসিক একটি অপারেশন করেন।

হোটেলের গেটে প্রহরারত পাকিস্তানি সেনা ও পুলিশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আলী আহমদ জিয়াউদ্দিনসহ তিনজন গাড়ি থেকে নেমে চারটি গ্রেনেড ছোড়েন। তখন পোর্চে দাঁড়ানো ছিল বিদেশি প্রতিনিধিদের ব্যবহৃত গাড়িবহর। সেগুলো দু-তিন মিনিট আগে বিদেশি প্রতিনিধিদের নিয়ে হোটেলে প্রবেশ করে। প্রথম ও চতুর্থ গ্রেনেড ছোড়েন আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিন। প্রথম গ্রেনেড বিস্ফোরণে বহরের শেভ্রোলেট গাড়িটি কয়েক ফুট ওপরে উঠে নিচে পড়ে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রেনেড ছোড়েন যথাক্রমে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী ও হাবিবুল আলম।

বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল এবং পাকিস্তানকে সাহায্য প্রদানকারী কনসোর্টিয়ামের চেয়ারম্যান তখন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তাঁরা উঠেছিলেন ইন্টারকন্টিনেন্টালে। উদ্দেশ্য ছিল, পাকিস্তানের, বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিরূপণ ও বৈদেশিক সাহায্যের চাহিদা এবং অন্যান্য পরিস্থিতি যাচাই করা। ঢাকায় তাঁদের অবস্থানের সময় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে। এই অপারেশনের বিশদ বর্ণনা আছে আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সহযোদ্ধা হাবিবুল আলমের ইংরেজিতে লেখা ব্রেভ অব হার্ট বইয়ে।

আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিন ১৯৭১ সালে শিক্ষার্থী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এপ্রিল মাসের প্রথমার্ধে ভারতে যান। ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন।

মুক্তিযোদ্ধা আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধকালে কয়েকজন সহযোদ্ধা মিলে এই মর্মে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁরা সবাই নিজ নিজ এলাকায় যাবেন। সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে সামাজিক ও কৃষি উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন। স্বাধীনতার পর তাঁর সহযোদ্ধাদের মধ্যে একমাত্র তিনিই তাঁর এ অঙ্গীকার রক্ষা করেন। এ কাজে এখনো তিনি আত্মনিবেদিত।

স্বাধীনতার প্রায় ২১ বছর পর ১৯৯২ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা ও পদক প্রদান করে। পরবর্তী সময়ে আরও দুবার এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিন কোনো সংবর্ধনায় যোগ দেননি এবং পদকও গ্রহণ করেননি।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান