বিজ্ঞাপন
default-image

১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিক। একদিন রাতে আলী আশরাফসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা আকস্মিক আক্রমণ চালান সাদুল্লাপুর থানায়। গাইবান্ধা জেলার একটি উপজেলা সাদুল্লাপুর। আক্রমণের শুরুতেই থানায় অবস্থানরত বাঙালি-অবাঙালি পুলিশ প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা, সবাই পালিয়ে গেল। মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হলো প্রচুর পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাগুলি। হস্তগত হওয়া সেইসব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তারা রওনা হলেন হাইড আউটের উদ্দেশে। তখন ভোরের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। তাঁদের হাইড আউট মোল্লার চরে। থানা সদর থেকে বেশ দূরে। সকাল হওয়ার আগেই ফিরতে হবে সেখানে।

থানা আক্রমণের সাফল্যে মুক্তিযোদ্ধারা উত্ফুল্ল। ফেরার সময় তাঁদের জন্য বিপদ অপেক্ষা করছে, সেটা তাঁরা বুঝতেও পারলেন না। বল্লমজাড় গ্রামে পৌঁছামাত্র মুক্তিযোদ্ধারা পড়ে গেলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অ্যামবুশে। আকস্মিক আক্রমণে তাঁরা দিশাহারা। বেশির ভাগ মুক্তিযোদ্ধা অসংগঠিত অবস্থায় ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেন।

আলী আশরাফ ও তাঁর দুই সহযোদ্ধা গুলি করতে করতে পিছু হটছিলেন, কিন্তু বেশিদূর যেতে পারেননি। তাঁদের দিকে ছুটে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে এলএমজির গুলি। তিনজনই গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।

এ অবস্থায় তাঁদের পক্ষে আর পশ্চাদপসরণ করা সম্ভব হয়নি। কয়েকজন গ্রামবাসীর সহায়তায় আশ্রয় নেন একটি বাড়িতে। গৃহকর্তা ও অন্যরা তাঁদের খুব সহায়তা করেন। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। কিছুক্ষণ পর রক্তের দাগ দেখে ওই বাড়িতে হাজির হলো একদল পাকিস্তানি সেনা। তাঁরা ধরা পড়ে গেলেন। পাকিস্তানি সেনারা আলী আশরাফের দুই সহযোদ্ধা ইসলামউদ্দিন ও ওমর ফারুককে তখনই হত্যা করে। এই দুজন ছিলেন পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর এয়ারম্যান। আর আলী আশরাফকে পাকিস্তানি সেনারা আটক করে গাইবান্ধায় নিয়ে যায়।

পরে আলী আশরাফ ঘটনাচক্রে বেঁচে যান। পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গাইবান্ধায় তাদের যে ক্যাম্পে নিয়ে যায়, সেই ক্যাম্পের একজন ক্যাপ্টেন ছিল তাঁর পরিচিত। ওই ক্যাপ্টেন তাঁর চিকিত্সার ব্যবস্থা করে। এরপর তাঁকে নাটোর জেলে পাঠানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৩ ডিসেম্বর তিনি আরও কয়েকজনের সঙ্গে জেল থেকে পালিয়ে যান।

আলী আশরাফ চাকরি করতেন পাকিস্তানি বিমানবাহিনীতে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন ঢাকায়। তখন তাঁর পদবি ছিল করপোরাল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকা থেকে পালিয়ে ময়মনসিংহ হয়ে ভারতে যান। সেখানে তিনি যুদ্ধে যেতে ইচ্ছুকদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন। পরে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সে। এরপর তাঁকে ১১ নম্বর সেক্টরের মানকারচর সাবসেক্টরে পাঠানো হয়। কিন্তু সাদুল্লাপুর ছাড়া আর কোনো অপারেশন বা যুদ্ধে তিনি অংশ নিতে পারেননি।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান