default-image

সারা দিন টহল আর খণ্ডযুদ্ধ শেষে ১০-১২ জনের একদল মুক্তিযোদ্ধা রাত ১২টার দিকে পালা করে বিশ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় খবর এল, পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে। দলনেতা আবুল খায়ের সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন তাদের প্রতিরোধ করতে। সামান্য অগ্রসর হতেই বুঝতে পারলেন, বেশ কিছুসংখ্যক পাকিস্তানি সেনা ৫০ থেকে ৬০ গজ দূরত্বের একটি আম-কাঁঠালের বাগানে অবস্থান করছে। আবুল খায়েরের সঙ্গে একজন গুলির বাক্স বহনকারী থাকলেও বাকি সহযোদ্ধারা তখন বেশ দূরে। ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। একটি গাছের আড়ালে অবস্থান নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিন দিক থেকে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করতে থাকে পাকিস্তানি সেনারা। তাঁর চোখের সামনে গুলির বাক্স বহনকারী যুবকের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। পেছনে থাকা সহযোদ্ধারা আর সামনের দিকে এগোতে পারলেন না। তাঁরা পশ্চাদপসরণে বাধ্য হলেন।

বিজ্ঞাপন

অন্ধকার রাতে আবুল খায়ের সম্পূর্ণ একা। সামনে অনেক পাকিস্তানি সেনা। তিনি কলেমা পড়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হলেন। জীবনের মায়া ছেড়ে দুটি প্রতিজ্ঞা করলেন, ‘অন্তত ১০-১২ জন পাকিস্তানি শত্রুসেনাকে না মেরে মরব না’ এবং ‘শত্রুর গুলি যদি লাগে, বুকে লাগবে, কিন্তু পিঠে লাগতে দেব না’। একাই গুলিবর্ষণ শুরু করলেন। অল্প সময়ের মধ্যে সামনের দিক থেকে গুলিবর্ষণ কমতে লাগল। অনুমান করলেন, পাকিস্তানি একাধিক সেনা গুলিবিদ্ধ হয়েছে। একপর্যায়ে তাঁর দুই হাতে একসঙ্গে গুলি লাগে। বাঁ হাতে দুটি আর ডান হাতে সাত-আটটি। দুই হাতই অবশ হয়ে গেল তাঁর। আর গুলি ছুড়তে পারছিলেন না। শত্রুসেনাদের বুঝতে না দিয়ে আহত আবুল খায়ের নিঃশব্দে পেছনের দিকে যেতে লাগলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর আবু বকর সিদ্দিক নামের এক সহযোদ্ধার (আনসার সদস্য) সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। তাঁর সহায়তায় দুই হাত পাটের রশি দিয়ে বেঁধে একটি খাল পার হয়ে ভোর পাঁচটার দিকে ভারতে পৌঁছান। বেঁচে যান তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা। ওই রাতে পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের ক্যাম্প দখল করে নেয়। পরে জানতে পারেন, তাঁর গুলিতে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়েছে। এ ঘটনা ১৯৭১ সালের ২২ আগস্টের। ঘটেছিল বুড়িপোতা এলাকায়।

বুড়িপোতা মেহেরপুরের অন্তর্গত একটি এলাকা। জেলা সদর থেকে এর অবস্থান পশ্চিম দিকে। পরে আহত আবুল খায়েরকে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের ব্যারাকপুর হাসপাতালে। ২৩ আগস্ট রাতে তাঁর দুই হাতে অপারেশন করা হয়।

আবুল খায়ের চাকরি করতেন ইপিআরে। কর্মরত ছিলেন যশোরে। ২৫ মার্চের পর তিনি যুদ্ধে যোগ দেন। আহত হওয়ার আগে যশোর ও মেহেরপুরে বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।

বিজ্ঞাপন