default-image

একাত্তরের জুন মাস। টাঙ্গাইলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের তত্পরতা খুব বেড়ে গেল। কাদেরিয়া বাহিনীর কয়েকজন কমান্ডার ভূঞাপুরের মুক্ত এলাকার এক ডাকবাংলোয় বসে আলোচনা করলেন করণীয় নিয়ে। শহরের ভেতরে গেরিলা অপারেশন চালানোর সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু সেখানে কে যাবেন? সহযোদ্ধাদের বলার পর রাজি হলেন আবুল কালাম আজাদ ও নজরুল ইসলাম বাকু। তাঁদের কয়েকটি গ্রেনেড দেওয়া হলো।

আবুল কালাম আজাদ ও নজরুল ইসলাম গ্রেনেডসহ অবস্থান নিলেন শহরের পাশের পাঁচকাহনিয়া গ্রামে। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, দুজন দুটি পৃথক স্থানে অপারেশন চালাবেন। আজাদ যাবেন রাজাকার কমান্ডার খোকা তালুকদারের বাড়িতে। খোকার নেতৃত্বেই রাজাকাররা শহরে খুন, ধর্ষণ, লুটপাটসহ নানা অপকর্ম করে। নজরুল ইসলাম যাবেন থানায়। প্রথমে আজাদ গ্রেনেড ছুড়বেন। শব্দ শুনে নজরুল ইসলামও গ্রেনেড ছুড়বেন থানার ভেতরে।

বিজ্ঞাপন

জুন মাসের শেষের দিকে একদিন সন্ধ্যায় আজাদ ও নজরুল ইসলাম শহরে ঢুকলেন। আজাদ গেলেন খোকা তালুকদারের বাড়ির পাশে, থানার পাশে গেলেন নজরুল ইসলাম। সারা রাত তাঁরা জঙ্গলে বসে থাকলেন মশার কামড় সহ্য করে। অপারেশন করবেন শেষ রাতে। তখন পাহারারত রাজাকার ও পুলিশের মধ্যে কিছুটা শিথিলতা থাকে। নির্ধারিত সময়ে আজাদ পর পর কয়েকটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করলেন খোকা তালুকদারের বাড়িতে। বিকট শব্দে সেগুলো বিস্ফোরিত হলো। ওই বাড়িতে তখন শুরু হয়ে গেছে মহাপ্রলয়। এরপর আজাদের আর কিছু দেখার সুযোগ ছিল না। কারণ, বিস্ফোরণের পর সেখানকার রাজাকার এবং শহরের অন্যান্য স্থানে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা গুলি করতে থাকে। তিনি দ্রুত ওই এলাকা থেকে সরে পড়েন। দৌড়াতে দৌড়াতে চলে যান শহরের বাইরে। ওদিকে নজরুল ইসলামও একই সময়ে থানার ভেতরে গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। সেই গ্রেনেডও বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়।

আবুল কালাম আজাদ ১৯৭১ সালে স্নাতক শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। টাঙ্গাইলের কাগমারীতে ২ মার্চ ছাত্র-যুবকদের অস্ত্রের প্রশিক্ষণ শুরু হলে তিনিও প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রতিরোধযুদ্ধে যোগ দেন। কাদেরিয়া বাহিনী গঠিত হলে তিনি এ বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হন। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিনি টাঙ্গাইল শহরের প্রধান সড়ক, সদর থানার ক্যাম্পাস, পোস্ট অফিস, পাওয়ার হাউসসহ কয়েকটি অপারেশনে অংশ নেন। তিনি মূলত ‘হিট অ্যান্ড রান’ পদ্ধতিতে গ্রেনেড হামলা চালাতেন। ১৭ আগস্ট টাঙ্গাইলে এক অপারেশনে আসার পথে তিনি ও নজরুল ইসলাম পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। তখনই ইকবাল হোসেন নামের এক রাজাকার পর পর নয়টি গুলি করে নজরুল ইসলামকে হত্যা করে। আজাদকে পাকিস্তানি সেনারা সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। কাদেরিয়া বাহিনী সম্পর্কে তথ্য জানার জন্য তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়।

বিজ্ঞাপন

চরম নির্যাতনেও আবুল কালাম আজাদ কোনো তথ্য দেননি। পরে তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসে পাঠানো হয়। সেখানেও চলে নির্যাতন। শেষে সামরিক আদালতে তাঁর বিচার হয়। বিচারে তাঁর ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১৫টি বেত্রাঘাতের আদেশ হয়। ২ ডিসেম্বর ঢাকায় কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁকে বেত্রাঘাত করা হয়। স্বাধীনতার পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।