default-image

আবদুস সবুর খানসহ ৩০-৩২ জনের একদল মুক্তিযোদ্ধা নদীর ঘাটে ওত পেতে বসে আছেন। সবার হাত অস্ত্রের ট্রিগারে, দৃষ্টি সামনে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখানে হাজির হলো ছয়-সাতজন পাকিস্তানি সেনা। একটু পর এল আরও ১০-১২ জন পাকিস্তানি সেনা। এখন তারা পুরোপুরি মুক্তিযোদ্ধাদের নাগালের মধ্যে। আবদুস সবুর খান এবং তাঁর সহযোদ্ধারা সংকেত পেয়ে একযোগে গুলি চালাতে শুরু করলেন। প্রথম ধাক্কায় চারজন পাকিস্তানি সেনা নদীতে গড়িয়ে পড়ল। তিনজন পড়ে রইল নদীর পাড়ে। একটু পর বেঁচে যাওয়া পাকিস্তানি সেনারাও গুলি শুরু করল। মেশিনগান, দুই ইঞ্চি-তিন ইঞ্চি মর্টার ও রকেট লঞ্চারের গোলাগুলিতে চারদিক প্রকম্পিত হতে লাগল। প্রায় আধা ঘণ্টা একনাগাড়ে যুদ্ধ চলল। তারপর থেমে থেমে চলল আড়াই ঘণ্টার মতো।

এ যুদ্ধে আবদুস সবুর খান বীরত্বের পরিচয় দেন। তিনি নদীর পাড়ে একবার ডানে, একবার বাঁয়ে গিয়ে এবং আধা মাইল দৌড়াদৌড়ি করে প্রায় তিন ঘণ্টা গুলি চালান। আধা মাইলজুড়ে মুক্তিবাহিনী অবস্থান নিয়েছে—পাকিস্তানি সেনাদের এ রকম ধোঁকা দেওয়াই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য। বিশৃঙ্খল পাকিস্তানি সেনারা সেখান থেকে পালিয়ে গেল। এ ঘটনা ১৯৭১ সালের ১৭ জুন সকালে ঘটেছিল টাঙ্গাইল জেলার বাসাইল উপজেলার পশ্চিমে কামুটিয়ায়।

বিজ্ঞাপন

আবদুস সবুর খান ছিলেন একজন নির্মাণশ্রমিক। ১৯৭১ সালে টাঙ্গাইলের সন্তোষে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন। পরে টাঙ্গাইলে কাদেরিয়া বাহিনী গঠিত হলে তিনি এতে যোগ দেন। তিনি ছিলেন কাদেরিয়া বাহিনীর একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। পরে তাঁকে একটি দলের নেতা হিসেবেও দায়িত্ব দেওয়া হয়। টাঙ্গাইলের বেশ কয়েকটি যুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। জুন থেকে আগস্ট—টানা তিন মাস কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নিয়ে পরিশ্রান্ত আবদুস সবুর বিশ্রামে ছিলেন টাঙ্গাইলের সুবিরচালা গ্রামে। এখানে থাকার সময় একদিন দুপুরে হইচই পড়ে যায়। জানতে পারেন, তিন মাইল দূরে মরিচা গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করেছে। সেখানে ছিল কাদেরিয়া বাহিনীর একটি দল। তারা পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়। সবুর খান ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে দেখতে পান, পাকিস্তানি সেনাদের বেশির ভাগ একটি নৌকায় করে নদী পাড় হয়ে বল্লার দিকে যাচ্ছে। কয়েকজন নদীর পাড়ে অপেক্ষা করছে নৌকার জন্য। এই সুযোগ হাতছাড়া করলেন না আবদুস সবুর খান।

নৌকা ঘাটে ফিরে এলে পাকিস্তানি সেনারা তাতে ওঠামাত্র মাঝি নৌকা ছেড়ে দিল। এমন সময় গর্জে উঠল আবদুস সবুর খানের অস্ত্র। চার-পাঁচজন পাকিস্তানি সেনা গুলিবিদ্ধ হয়ে নদীতে পড়ে গেল। তিনজন নৌকার ওপর লুটিয়ে পড়ল। যেসব পাকিস্তানি সেনা নদীর ওপাড়ে ছিল, তারা এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে চালাতে পালিয়ে গেল। এ ছাড়া পাথরঘাটা, বল্লা, বাথুলি, চাড়ান, এলাসিন, নাগরপুর, বাসাইল ও মির্জাপুরের যুদ্ধেও অসাধারণ কৃতিত্ব দেখান তিনি।

বিজ্ঞাপন