default-image

রাত তখন আটটা পাঁচ বা দশ। সবুজ রঙের একটি কার ব্রেক কষে থেমে পড়ল ব্যস্ত গলির মুখে। সেই কার থেকে ক্ষিপ্রগতিতে নামলেন আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েলসহ পাঁচজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা। চারজনের হাতেই স্টেনগান। একজনের হাতে এসএমজি। এক মিনিটের মধ্যে তাঁরা অবস্থান নিলেন সুবিধাজনক একটা জায়গায়। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে গর্জে উঠল সবার অস্ত্র। অদূরে পাকিস্তানি সেনাদের চেকপোস্টে প্রহরারত ছিল পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার মিলে ১২-১৩ জন। আবদুল হালিম চৌধুরী ও তাঁর সহযোদ্ধাদের ছোড়া আকস্মিক গুলির আঘাতে নিহত হলো চারজন পাকিস্তানি সেনা ও ছয়জন রাজাকার।

এ ঘটনা ১৯৭১ সালের। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা মহানগরের ফার্মগেটের। সেখানে তখন ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট। প্রহরায় ছিল মিলিটারি পুলিশ ও রাজাকারের দল। সার্বক্ষণিক পাহারায় নিয়োজিত ছিল তারা। ওখানেই ছিল তাদের বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থা। মুক্তিবাহিনীর ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা সেখানে অপারেশন করেন। অপারেশনে অংশ নেন পাঁচজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা: জুয়েল, বদি, আলম ও পুলু। আরেকজন সামাদ। তিনি ছিলেন গাড়ির চালক।

বিজ্ঞাপন

সেদিন দুপুরের দিকে অপারেশনের আগে তাঁরা জায়গাটা রেকি করেছিলেন। তারপর গোপন আস্তানায় ফিরে পরামর্শ শেষে সেদিনই তাঁরা অপারেশন করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। সময় নির্ধারণ করেন রাত আটটা দশ মিনিট। নিউ ইস্কাটনের গোপন আস্তানা থেকে তাঁরা গাড়িতে করে রওনা হন সন্ধ্যা সাতটা ৫০ মিনিটে। ফার্মগেটে এসে গাড়িটি ডানে ঘুরে হলি ক্রস কলেজের গলির ভেতর ঢুকে থেমে যায়। এরপর তাঁরা ক্ষিপ্রগতিতে গাড়ি থেকে নেমে পড়েন। দ্রুত অপারেশন করে তাঁরা সটকে পড়েন ওই গাড়িতে নিয়েই।

আবদুল হালিম চৌধুরী ১৯৭১ সালে ঢাকার জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মে মাসের শেষ দিকে ঢাকা থেকে পালিয়ে তিনি ভারতের ত্রিপুরার মেলাঘরে যান। সেখানে তাঁকে মুক্তিবাহিনীর ক্র্যাক প্লাটুনে অন্তর্ভুক্ত করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে ঢাকায় এসে গেরিলা অপারেশন শুরু করেন। ফার্মগেট ছাড়াও এলিফ্যান্ট রোডের পাওয়ার স্টেশন, যাত্রাবাড়ী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে গেরিলা অপারেশনে যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দেন তিনি। ১৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে গেরিলা অপারেশনের জন্য রেকি করার সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাল্টা আক্রমণে তিনি আহত হন। এরপর তিনি ঢাকার বড় মগবাজার এলাকায় একটি বাড়িতে চিকিত্সাধীন ছিলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের এদেশীয় দোসরদের মাধ্যমে তাঁর খবর পেয়ে যায়। ২৯ আগস্ট ওই বাড়িতে হানা দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে আটক করে। তাঁর ওপর তারা চালায় অমানুষিক নির্যাতন। পরে তাঁকে হত্যা করে।

বিজ্ঞাপন