default-image

রাতে পাহাড়ি পথে হেঁটে আবদুল হাকিমসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা পৌঁছালেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানের কাছে। সেখানে কোদাল-খন্তা চালিয়ে শুরু করলেন ছোট পরিখা খোঁড়ার কাজ। ভোরের আলো ফোটার আগেই শেষ হলো সেই কাজ। তারপর তাঁরা অবস্থান নিলেন পরিখার ভেতর। মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের আড়াল করে চুপচাপ আছেন। অধিনায়কের সংকেত পেলেই তাঁরা একযোগে আক্রমণ চালাবেন। কিন্তু তার আগেই পাকিস্তানি সেনারা তাদের সুরক্ষিত প্রতিরক্ষা অবস্থান থেকে শুরু করল আর্টিলারি ও মর্টারের গোলাবর্ষণ। শত শত গোলা পড়তে লাগল মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর। গোলাবর্ষণ ও গুলিতে মুক্তিযোদ্ধাদের মাথা তোলাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ল। চরম প্রতিকূল অবস্থা সত্ত্বেও পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ মোকাবিলা করতে লাগলেন আবদুল হাকিমসহ কয়েকজন। কিন্তু আবদুল হাকিম বেশিক্ষণ লড়াই করতে পারলেন না। হঠাত্ একসঙ্গে চার-পাঁচটি গুলি এসে লাগল তাঁর চোখ, বুক ও কোমরে। এ ঘটনা ১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বরের। ঘটেছিল সিলেটের গোয়াইনঘাট এলাকার রাধানগরে।

বিজ্ঞাপন

রাধানগর সীমান্ত এলাকার একটি বাজার। বাজারের পূর্ব পাশ দিয়ে পিয়াইন নদের শাখা প্রবাহিত। এর উত্তর পারে জাফলং চা-বাগান। উত্তর-পূর্ব দিকে কয়েক মাইল দূরে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিওপি তামাবিল এবং ভারতের ডাউকি বিওপি। রাধানগরসহ গোয়াইনঘাট এলাকায় ছিল পাকিস্তানি সেনাদের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অবস্থান। এখানে প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, পাঞ্জাব রেঞ্জার ও টসি ব্যাটালিয়ন। অক্টোবরের শেষ দিকে নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানে আক্রমণের জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভেতরে আসে। ৫ নভেম্বর রাধানগরে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। মুক্তিবাহিনীর ৪ নম্বর সেক্টরের ডাউকি সাব-সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা, জেড ফোর্সের তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও মিত্রবাহিনীর ৫/৫ গোর্খা রেজিমেন্টের একদল সেনা যৌথভাবে এ যুদ্ধে অংশ নেয়। সেদিন মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর আক্রমণ ব্যর্থ হয়। যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর বেশ কয়েকজন যোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য শহীদ হন। আহত হন আবদুল হাকিমসহ অনেকে। আবদুল হাকিমকে সহযোদ্ধারা উদ্ধার করে ভারতের শিলং হাসপাতালে পাঠান। সেখানে তিনি চিকিত্সাধীন অবস্থায় দেশ স্বাধীন হয়।

আবদুল হাকিম চাকরি করতেন ইপিআরে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রাম ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্টারের অধীনে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন। এরপর ১ নম্বর সেক্টর এলাকায় কিছুদিন যুদ্ধ করেন। পরে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আলফা কোম্পানিতে। ছাতক, গোয়াইনঘাটসহ কয়েকটি জায়গায় তিনি যুদ্ধ করেন।

বিজ্ঞাপন