default-image

আবদুল মোতালেবসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা রাতের অন্ধকারে ভারতের ভূখণ্ড থেকে প্রবেশ করলেন বাংলাদেশে। হেঁটে নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তাঁদের গন্তব্য মোহনপুর। সেখানে আছে একটি সেতু। সেতুটিকেই তাঁরা ধ্বংস করবেন। এর কাছাকাছিই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থান। তারা যেকোনো সময় আক্রমণ করতে পারে। সকাল হওয়ার আগেই তাঁরা পৌঁছে গেলেন নির্দিষ্ট স্থানে। সেতুর আশপাশে দ্রুত প্রতিরক্ষা অবস্থান নিলেন তাঁরা। বিস্ফোরক দলের সদস্যরা কয়েক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় কাজ সম্পন্ন করলেন। তখন সকালের আলোয় চারদিক উজ্জ্বল। বিকট শব্দে ধ্বংস হয়ে গেল সেতু। শব্দ পেয়ে কাছাকাছি থাকা পাকিস্তানি সেনারা গাড়িযোগে দ্রুত এসে তাঁদের ওপর আক্রমণ করল।

বিজ্ঞাপন

অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাদের অবিরাম গোলাগুলি বর্ষণে মুক্তিযোদ্ধারা বেশির ভাগ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেন। কিন্তু আবদুল মোতালেবের দলটি তাদের অবস্থান ধরে রাখল। পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকল। শহীদ হলেন তাঁর দুজন মুক্তিযোদ্ধা। আহত হলেন তিন-চারজন। একটু পর আবদুল মোতালেবও গুরুতর আহত হলেন। এতে তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হলো। কয়েকজন সহযোদ্ধা তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নিয়ে প্রাথমিক চিকিত্সা দিলেও রক্তক্ষরণ বন্ধ হলো না। তখন সহযোদ্ধারা গ্রামবাসীর সহায়তায় উন্নত চিকিত্সার জন্য তাঁকে পাঠিয়ে দিলেন সীমান্তের ওপারে। পথেই তিনি মারা গেলেন। পরে তাঁকে ভারতের বাঙালপাড়ায় সমাহিত করা হয়। এ ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত মোহনপুরে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধযুদ্ধ করতে করতে সমবেত হন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে। সেখানে সমবেত হওয়ার পর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট তিনটি দলে বিভক্ত হয়। একটি দলের নেতৃত্বে থাকেন ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন (বীর প্রতীক, পরে মেজর জেনারেল)। এই দলে ছিলেন আবদুল মোতালেব। তাঁরা ৯, ১০, ১১ ও ১৯ এপ্রিল বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এরপর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের কামারখালীতে অবস্থান নেন। সেখানে অবস্থানকালে মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভেতরে বেশ কয়েকটি অপারেশন পরিচালনা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা ভারত থেকে এসে মোহনপুর সেতু ধ্বংস করেন।

বিজ্ঞাপন

আবদুল মোতালেব পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালে এই রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল সৈয়দপুর সেনানিবাসে। ৩০ মার্চ রাতে তাঁরা আক্রান্ত হন। তখন তাঁরা বিদ্রোহ করে সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।