default-image

৮ অক্টোবর, ১৯৭১। ভরা বর্ষার নদী। দুই কূল ছাপিয়ে পানি উথলে উঠছে। রাতে নদীতে টহলরত পাকিস্তানি গানবোট ও বন্দরের সার্চলাইটের তীব্র আলো চারদিক ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে। এর মধ্যেই নদীতে নেমে সাঁতরে এগিয়ে যাচ্ছেন একদল নৌ-কমান্ডো। ১৮ জনের মধ্যে একজন আবদুল মালেক। তাঁদের লক্ষ্য বন্দরে নোঙর করা জাহাজ। মৃত্যুভয় তাঁদের দৃঢ়তার কাছে হার মানে। সবাই অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে জাহাজের সামনে, মাঝে ও পেছনে লিমপেট মাইন লাগিয়ে অতি দ্রুত তীরে ফিরতে থাকেন। তাঁরা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেরার আগেই শুরু হয় বিস্ফোরণ। সঙ্গে সঙ্গে বেজে ওঠে বন্দরের সাইরেন। পাকিস্তানি সেনারাও তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মাইনের বিস্ফোরণ, সাইরেন ও গুলির শব্দে গোটা বন্দর এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

এ ঘটনা ঘটেছিল মংলা বন্দরে। সেদিন নৌ-কমান্ডোরা এ বন্দরের পশুর নদে নোঙর করা কয়েকটি জাহাজ লিমপেট মাইনের সাহায্যে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ডুবিয়ে দেন। এ জন্য নৌ-কমান্ডোরা ভারত থেকে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মংলা বন্দর এলাকায় আসেন। ক্যাম্প স্থাপন করেন কৈলাসগঞ্জে। সেখান থেকে মংলা বন্দরে পৌঁছানো সহজ ছিল। অপারেশনের আগে তাঁরা বন্দরে রেকি করেন। নির্দিষ্ট দিন সন্ধ্যার আগেই রাতের খাবার খেয়ে নৌ-কমান্ডোরা স্থল মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মংলা বন্দরের উদ্দেশে রওনা হন।

বিজ্ঞাপন

ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। কোনো অবস্থাতেই আলো জ্বালানো যাবে না। নৌকার মাঝিরা স্থানীয় হওয়ায় তাঁদের রাস্তা চিনতে অসুবিধা হয় না। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁরা পৌঁছে যান নির্দিষ্ট জায়গায়। নদীতে নামার আগে নৌকার মধ্যেই তাঁরা সব প্রস্তুতি সেরে নেন। তারপর নেমে পড়েন নদীর পানিতে। সাঁতরে এগিয়ে যেতে থাকেন জাহাজের দিকে, আর সঙ্গে থাকা স্থলযোদ্ধারা নদীর পাড়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। কমান্ডোরা ছয় ভাগে বিভক্ত হয়ে ছয়টি জাহাজের দিকে যান। সব দলই সাফল্যের সঙ্গে জাহাজে লিমপেট মাইন সংযুক্ত করতে সক্ষম হন।

আবদুল মালেক পাকিস্তানি নৌবাহিনীতে চাকরি করতেন। ছুটিতে থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারতে যান। পরে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডো দলে। তিনি যেসব জায়গায় অপারেশন ও যুদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে আশুগঞ্জ ফেরিঘাট অপারেশন, কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বাতাকান্দি বাজার এবং ঢাকার যাত্রাবাড়ীর যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তিনি পূর্ব পাকিস্তান নৌপরিবহন সংস্থার ঢাকার কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় নৌপথের মানচিত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র সংগ্রহ করেন। এগুলো নৌ-কমান্ডোদের অপারেশনে যথেষ্ট কাজে লাগে।

আবদুল মালেক ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী থেকে অবসর নেন।