default-image

১৯৭১ সালের মে মাসের একদিন। ৬ বা ৭ মে। ভোরে আবদুর রহমান একজন সহযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়ার নিজেদের প্রতিরক্ষা অবস্থান থেকে বেরিয়ে পড়লেন রেকি করার উদ্দেশ্যে। বেলা ১১টায় সেখানে ফিরে এসে দেখেন, চারদিক লন্ডভন্ড। পড়ে আছে কয়েকজন সহযোদ্ধার রক্তাক্ত নিথর দেহ। এমন ঘটনার মুখোমুখি হবেন, ভাবতেই পারেননি। বুঝতে পারলেন, পাকিস্তানি সেনাদের আকস্মিক আক্রমণেই এ অবস্থা। ফলে সতর্ক হলেন তিনি। ভাবলেন, পাকিস্তানি সেনারা নিশ্চয়ই তাদের আশপাশেই আছে। তাঁকে এখান থেকে দ্রুত সরে পড়তে হবে। সঙ্গে থাকা সহযোদ্ধাদের সবাই পালিয়ে গেছেন। কিন্তু তিনি আর সরে পড়ার সুযোগ পেলেন না। পড়ে গেলেন একজন পাকিস্তানি সেনার সামনে। ওই পাকিস্তানি সেনা তাঁকে থামার নির্দেশ দিল। তখন মনে হলো, এই পাকিস্তানি সেনার গুলিতে মরার চেয়ে নিজের পিস্তলের গুলিতে আত্মবিসর্জন দেওয়াই শ্রেয়। তাঁর মনজুড়ে চলছে প্রচণ্ড তোলপাড়। তারপর নিমেষে নিজের কাছে থাকা পিস্তল বের করে কী মনে করে গুলি করেন ওই পাকিস্তানি সেনাকে লক্ষ্য করে। লুটিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাটি। গুলির শব্দ শুনে সেখানে এগিয়ে এল আরও দুজন পাকিস্তানি সেনা। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের লক্ষ্য করে গুলি করলেন তিনি। দুই পাকিস্তানি সেনাই লুটিয়ে পড়ল। এরপর তিনি দ্রুত ছুটে গিয়ে অবস্থান নিলেন সেখানকার এক বাংকারে।

বিজ্ঞাপন

বাকি পাকিস্তানি সেনারা ছিল বেশ দূরে। পরিস্থিতি তাঁর সহায় হলো। ওই বাংকারে ছিল একটি গুলিভর্তি মেশিনগান। অস্ত্রটা হাতে নিয়ে তিনি গুলি করতে লাগলেন। তখন পাকিস্তানি সেনারা দৌড়াদৌড়ি করে পিছিয়ে যেতে থাকল। তিন-চারজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। এই ফাঁকে ওয়্যারলেস মারফত তিনি যোগাযোগ করলেন তাঁর অধিনায়কের সঙ্গে। অধিনায়ক তাঁকে নির্দেশ দেন দ্রুত ওই জায়গা থেকে সরে পড়ার। তিনি অধিনায়কের কাছে গোলা ছোড়ার অনুরোধ জানান। তাঁর সহযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ্য করে তিন ইঞ্চি মর্টারের গোলা নিক্ষেপ করতে থাকেন। এই সুযোগে তিনি দ্রুত ক্রল করে পশ্চাদপসরণ করেন। সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছার পর সহযোদ্ধারা তাঁকে ভারতে নিয়ে যান।

আবদুর রহমান চাকরি করতেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। যশোর সেনানিবাসে আক্রান্ত হওয়ার পর সেখান থেকে পালিয়ে যান। পরে দলের কাউকে খুঁজে না পেয়ে নিজের এলাকা হবিগঞ্জে এসে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যোগ দেন। পরে তাঁকে একাদশ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যুদ্ধ করেন শাহজীবাজার, মাধবপুর, হরষপুর, আখাউড়া, ভৈরব, আশুগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায়।

বিজ্ঞাপন