default-image

ফুলছড়িঘাট গাইবান্ধা জেলার অন্তর্গত। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বগুড়া-গাইবান্ধা রেললাইনের একটি শাখা ফুলছড়িঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত। নদীর অপর পাড়ে বাহাদুরাবাদঘাট। মাঝে যমুনা নদী। তখন যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে দেশের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে এ ঘাট ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্রশস্ত্র, রসদ ও খাদ্য নিয়ে নানা ধরনের জাহাজ এখানে ভিড়ত। এখান থেকে সেগুলো পাঠানো হতো বগুড়া, রংপুর, গাইবান্ধা, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন স্থানে। অক্টোবরে নৌ-কমান্ডোরা ফুলছড়িঘাটে অপারেশন চালানোর পরিকল্পনা করেন। অপারেশনে নেতৃত্ব দেন নৌ-কমান্ডো আবদুর রকিব মিয়া। শেষ পর্যন্ত এই অপারেশন ব্যর্থ হয়।

২৫ অক্টোবর গাইড মুক্তিযোদ্ধা কালাচাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করে আবদুর রকিব মিয়া নৌ-কমান্ডোদের নিয়ে বাহাদুরাবাদের দক্ষিণে একটি মাদ্রাসার পাশ দিয়ে পাঁচ মাইল প্রশস্ত যমুনা নদীতে নেমে পড়েন। প্রত্যেকের বুকে বাঁধা লিমপেট মাইন। তখন গভীর রাত। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় নদীতে তখন তীব্র স্রোত। রকিব মিয়া সহযোদ্ধাদের নিয়ে স্রোতের অনুকূলে সাঁতরে ফুলছড়িঘাটের কাছে আসেন। কিন্তু তাঁদের দুর্ভাগ্য, জাহাজের পেছনে পৌঁছানো মাত্র সেগুলো যাত্রা শুরু করে। প্রপেলারের আঘাতে সৃষ্ট প্রচণ্ড ঘূর্ণিস্রোতে কয়েকজন নৌ-কমান্ডো তলিয়ে যান। প্রপেলারের পাখার আঘাতে আবদুর রকিব মিয়াসহ কয়েকজন শহীদ হন। যমুনার প্রবল স্রোতে তাঁদের শরীরের খণ্ডবিখণ্ড অংশ ভেসে যায়। এ ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবরে ফুলছড়ি রেলঘাটে।

বিজ্ঞাপন

আবদুর রকিব মিয়া চাকরি করতেন পাকিস্তানি নৌবাহিনীতে। ১৯৭১ সালে ফ্রান্সে সাবমেরিনার হিসেবে প্রশিক্ষণরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সেখান থেকে পালিয়ে ভারতে এসে যুদ্ধে যোগ দেন। ফুলছড়িঘাট অপারেশনই ছিল তাঁর প্রথম ও শেষ অভিযান। অক্টোবরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত আবদুর রকিব মিয়া ভারতের ক্যাম্পে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর যুদ্ধে যোগ দিতে আটজন নৌ-কমান্ডো নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য ফুলছড়িঘাটে অবস্থানরত রসদ বহনকারী জাহাজ মাইন দিয়ে ধ্বংস করা।

আবদুর রকিব মিয়ার মা-বাবা জানতেন না তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানি নৌবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর থেকে মা-বাবার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল না।