বিজ্ঞাপন
default-image

মেজর খালেদ মোশাররফের (পরে বীর উত্তম ও মেজর জেনারেল) নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট আশুগঞ্জ, উজানিসর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অ্যান্ডারসন খালের পাশে প্রতিরক্ষা অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৪ এপ্রিল স্থল, বিমান ও নৌ—তিন পথেই পাকিস্তানি বাহিনী তাদের ওপর প্রচণ্ড হামলা চালায়। মোস্তফা কামাল ছিলেন গঙ্গাসাগর প্রতিরক্ষা অবস্থানের দরুইন গ্রামে আলফা কোম্পানির ২ নম্বর প্লাটুনের একজন সেকশন কমান্ডার। ১৭ এপ্রিল সকাল থেকে মোস্তফা কামালদের অবস্থানের ওপরও তীব্র গোলাবর্ষণ শুরু হয়। সঙ্গে শুরু হয় বৃষ্টি। প্রচণ্ড আক্রমণ সামাল দিতে শাফায়াত জামিল সেখানে ডি কোম্পানির ১১ নম্বর প্লাটুন পাঠান। সারা দিন যুদ্ধ চলে।

পরদিন সকালে বৃষ্টির মধ্যে পাকিস্তানি সেনারা দরুইন গ্রামের কাছে পৌঁছায়। মুক্তিযোদ্ধারা দরুইন গ্রাম থেকে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিলেও মোস্তফা কামাল থেকে গিয়ে বলেন, তাঁর তুলনায় সহযোদ্ধাদের অনেকের প্রাণের মূল্য বেশি।

মোস্তফা কামালের হাতে অনেক পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। তারা মরিয়া হয়ে গোলাবর্ষণ করতে থাকে। একপর্যায়ে মোস্তফা কামালের গুলি নিঃশেষ হয়ে যায়। তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে বাংকারে এনে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ দিয়ে সম্মান জানায়।

পাকিস্তান উপহাইকমিশন বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে

মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে শপথ নেওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় কর্মরত পাকিস্তানের বাঙালি উপহাইকমিশনার হোসেন আলী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করেন। তিনি একা নন, উপহাইকমিশনের আরও চারজন বাঙালি কর্মকর্তা এবং প্রায় ৬০ জন কর্মচারী আনুগত্য প্রকাশ করে বাংলাদেশের পক্ষে চলে আসেন।

পাকিস্তান উপহাইকমিশনের বাঙালি কর্মীরা ৯ নম্বর পার্ক সার্কাস অ্যাভিনিউর কার্যালয়টি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এরপর উপহাইকমিশনের নামফলক সরিয়ে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মিশন’ নামফলক লাগানো হয়।

বাংলাদেশকে স্বীকৃতির আহ্বান

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী কাশীকান্ত মৈত্র এবং সিপিআই (এম) নেতা জ্যোতি বসু আলাদাভাবে বলেন, বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি না দিলে পশ্চিমবঙ্গ নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। জ্যোতি বসু স্বীকৃতির পাশাপাশি বাংলাদেশকে অস্ত্র ও প্রয়োজনীয় সাহায্যও দিতে বলেন।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ বসু, প্রিন্সিপাল পি কে বোস, ড. পুরবী বসু মল্লিক, বিচারপতি শঙ্করপ্রসাদ মিত্র, বিচারপতি এস এ মাসুদ এবং ড. রমা চৌধুরীসহ পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা ১৩ জন বুদ্ধিজীবী শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য আহ্বান জানান।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের ব্রিটিশ হাইকমিশন থেকে এদিন এক ঘোষণায় বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের দুঃখজনক পরিস্থিতির জন্য হাইকমিশন ২১ এপ্রিল রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্মদিন উদ্‌যাপন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং মুম্বাইয়ে সাংবাদিকদের বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহকে আর পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে গ্রহণ করা যায় না। অল ইন্ডিয়া সিভিল লিবার্টির সভাপতি এবং সাবেক এমপি এন সি চট্টোপাধ্যায় কেনেথ কিটিংয়ের সাহসী ও সুস্পষ্ট বক্তব্যকে স্বাগত জানান এবং সহমত পোষণ করেন।

বাংলাদেশের ভেতরে

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান রাতে এক বেতার ভাষণ দেন। তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে ভারতের দাসত্ব থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে মুক্ত রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী অনুপ্রবেশকারী ও দুষ্কৃতকারীদের ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। কেউ তাদের প্রশ্রয় দিলে বিপদে পড়বে।

সামরিক কর্তৃপক্ষও মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় না দিতে নাগরিকদের প্রতি আবার নির্দেশ জারি করে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আখাউড়ায় এবং চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে দিনভর দুই পক্ষে প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। রাঙামাটির কুতুবছড়িতে বেলা তিনটায় অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের সমন্বয়ে গড়া একদল মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছয়টি ট্রাকে অ্যামবুশ করেন। তাতে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং দু-তিনটি গাড়ি ধ্বংস হয়।

পিপিপির ভাষ্য

পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) ভাইস চেয়ারম্যান মিয়া মাহমুদ আলী কাসুরি লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আওয়ামী লীগ আগেই পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং এ লক্ষ্যে কৌশল স্থির করেছিল।

তিনি বলেন, এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয় যে ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তানিরা কেন্দ্রের ক্ষমতা অবজ্ঞা করে শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের সার্বভৌম প্রধানরূপে প্রতিষ্ঠার জন্য রাতারাতি নিজেদের প্রস্তুত করেছে। ১৫ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ শেখ মুজিব যখন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করছেন, তখন ঢাকায় পাকিস্তানের প্রতিটি প্রতীক ধ্বংস করা হচ্ছিল। ২৩ মার্চ পুরো শহরে সরকারি ও বেসরকারি ভবনে বাংলাদেশের পতাকা তোলা হয় এবং শেখ মুজিব বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর কুচকাওয়াজে অভিবাদন নিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌম শাসক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন। পরিস্থিতি পুরোপুরি শেখ মুজিবের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, দ্বিতীয়, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড; বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক, দুই ও আট; দৈনিক পাকিস্তান, ১৯ এপ্রিল ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ১৯ এপ্রিল ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান