বিজ্ঞাপন
default-image

মুক্তিবাহিনীর নৌকমান্ডোরা ১৬ আগস্ট ভোরে (মতান্তরে ১৫ আগস্ট) চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে অপারেশন জ্যাকপট নামে এক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন। পরিকল্পনা ছিল, সমুদ্র ও নদীবন্দরগুলোতে একযোগে আক্রমণ পরিচালনা করার জন্য আকাশবাণী কলকাতা থেকে সংকেত হিসেবে গান প্রচার করা হবে। প্রথম গানটি বাজে ১৩ আগস্ট। এর মানে ছিল, আক্রমণ সন্নিকটে। ১৫ আগস্ট সকাল সাড়ে সাতটায় দ্বিতীয় গানটি সংকেত হিসেবে বাজলে নৌকমান্ডোরা রাতে বেরিয়ে পড়েন।

১৬ আগস্ট ভোরে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং দেশের অভ্যন্তরে চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে কাছাকাছি সময়ে অভিযান পরিচালিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন বন্দরে পাকিস্তানি বাহিনীর বহু অস্ত্র ও রসদবাহী জাহাজ ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দাউদকান্দি ফেরিঘাটেও আরেকটি অভিযানের কথা ছিল। সময়মতো সেটি পরিচালনা করা যায়নি। ১৭ আগস্ট ভোরে সেটি সম্পন্ন করা হয়।

নৌকমান্ডোরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে অভিযানে অংশ নেন। তাঁদের লক্ষ্যবস্তুগুলো ছিল চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, চাঁদপুর নৌবন্দর, দাউদকান্দি ফেরিঘাট, নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দর, মোংলা সমুদ্রবন্দর ও হিরণ পয়েন্ট। চট্টগ্রামে অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন এ ডব্লিউ চৌধুরী, চাঁদপুরে বদিউল আলম, দাউদকান্দিতে শাহজাহান সিদ্দিকী, নারায়ণগঞ্জে আবিদুর রহমান, মোংলায় মো. আহসানুল্লাহ এবং হিরণ পয়েন্টে হুমায়ূন কবির। ৬০ জন সদস্য নিয়ে প্রথম দল ছিল চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর আক্রমণের জন্য, চাঁদপুর বন্দরের জন্য ২০ জন, নারায়ণগঞ্জ বন্দরের জন্য ১২ জন, দাউদকান্দি ফেরিঘাটের জন্য ৮ জন, হিরণ পয়েন্টের জন্য ১২ জন এবং মোংলা সমুদ্রবন্দর আক্রমণের জন্য ৪৮ জন।

১৭ আগস্টের আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতার সংবাদ শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশের দরিয়ায় বিস্ফোরণে বিদেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত’। সংবাদে বলা হয়, ‘মুক্তিফৌজ জলের তলায় বিস্ফোরণ ঘটানোয় বাংলাদেশের বন্দরে সোমবার [১৬ আগস্ট] সকালে একটি বিদেশি জাহাজ দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।...সেখানে জলের তলে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। জাহাজ থেকে পাঠানো বার্তায় বলা হয়, দারুণ ক্ষতি হয়েছে, জাহাজের খোলে জল ঢুকেছে এবং এখন নোঙর ছেঁড়া অবস্থায় নিরুদ্দেশের দিকে ভেসে চলেছে।’

পাকিস্তান গণহত্যার দায়ে অপরাধী

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের শরণার্থীবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পাকিস্তান গণহত্যার অপরাধে দোষী। শরণার্থীশিবিরগুলো পরিদর্শন করার পর তিনি সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছেন, বাংলাদেশের শরণার্থীদের সবাই পাকিস্তানি শাসন থেকে মুক্তি চান। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচিত নেতাদের সঙ্গেই কেবল বোঝাপড়া হতে পারে। তিনি বলেন, শেখ মুজিবের একমাত্র অপরাধ নির্বাচনে জয়লাভ। তাঁর গোপন বিচার আন্তর্জাতিক আইনের ঘোর নীতিবিরুদ্ধ। এর আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রায় ৪৫ মিনিট বৈঠক করেন।

রাশিয়ার হুঁশিয়ারি

সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৬ আগস্ট ভারতের দুই প্রতিবেশী পাকিস্তান ও চীনকে এই বলে হুঁশিয়ার করে দেয় যে ভারত-সোভিয়েত শান্তি চুক্তির পুরো তাৎপর্য ভালো করে বুঝে-শুনে ভবিষ্যতে তাদের কাজে হাত দিতে হবে। মস্কোতে কূটনৈতিক সূত্র সাংবাদিকদের জানায়, সুপ্রিম সোভিয়েত প্রেসিডিয়ামের বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকোর বক্তৃতায় এই হুঁশিয়ারি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চুক্তিবদ্ধ দুই পক্ষের কারও বিরুদ্ধে আক্রমণ বা আক্রমণের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে চুক্তির অঙ্গীকার সম্পর্কে বক্তব্য দিতে গিয়ে আন্দ্রে গ্রোমিকো ঘোষণা করেন, এই চুক্তির কথা না ভেবে এখন থেকে আর কেউই সোভিয়েত ইউনিয়ন বা ভারত সম্পর্কে কোনো নীতি গ্রহণ করবে না।

ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র, ভুলের মর্মান্তিক কাহিনি’ শীর্ষক এক নিবন্ধে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত চেস্টার বোল্‌জ পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহকে দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং নীতিগর্হিত কাজ বলে অভিহিত করেন। তিনি প্রস্তাব দেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তার নিজের ভুল সংশোধন করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে সরাসরি মুজিবের সঙ্গে আলোচনায় বসানো।

ভারতে আসা বাংলাদেশের লাখ লাখ শরণার্থী যাতে স্বদেশে ফিরে যেতে পারেন, তার জন্য পূর্ব বাংলা সংকটের একটা রাজনৈতিক ফয়সালা করতে সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘের বৈষম্য নিবারণ ও সংখ্যালঘু রক্ষাসংক্রান্ত সাব-কমিশনকে জরুরি ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানায়। সাব-কমিশনের বৈঠকে সোভিয়েত প্রতিনিধি এ আহ্বান জানিয়ে চলেন, মানবাধিকার সম্পর্কে জাতিসংঘের ঘোষণার সঙ্গে সংগতি রেখে এ ব্যবস্থা নিতে হবে। বৈঠকে পাকিস্তানি প্রতিনিধি এস খান বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করার জন্য বিভিন্ন সংস্থার সমালোচনা করে বক্তব্য দিলে সোভিয়েত প্রতিনিধি এই বিবৃতি দেন। পাকিস্তানের প্রতিনিধি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ চলছে। সুতরাং বিষয়টি অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।

পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের নির্দেশ

পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক গভর্নর ও ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খান এদিন সামরিক বিধি ও পাকিস্তানের দণ্ডবিধি অনুসারে আনীত অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য আগামী ২১ আগস্ট সকাল আটটার মধ্যে ২ নম্বর সেক্টরের উপসামরিক শাসনকর্তার নাটোরের আদালতে হাজির হওয়ার জন্য ১৪ জন নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্যকে নির্দেশ দেন। নির্দেশে বলা হয়, হাজির হতে ব্যর্থ হলে তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিচার হবে।


সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান, ১৭ আগস্ট ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকাযুগান্তর, ভারত, ১৭ ও ১৮ আগস্ট ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান