বিজ্ঞাপন
default-image

ভারত সফররত যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ এবং ভারতে দেশটির সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক জন কেনেথ গলব্রেথ ৮ সেপ্টেম্বর কলকাতায় সাংবাদিকদের বলেন, পূর্ব বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছে, এ ব্যাপারে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই। এই গণহত্যা সংঘটনে যারা অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছে, তারাও গণহত্যাকারীর মতো সমান অপরাধে অপরাধী। তাই নিক্সন ও তাঁর সরকারও একই অপরাধে অপরাধী। তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুযায়ী বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ।

ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি হায়দরাবাদে রোটারি ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশে যে ব্যাপক গণহত্যা চলছে, অনেক দেশ তা জেনেও মুখ খুলছে না। এটা খুবই দুঃখের কথা যে বাংলাদেশের এই মর্মন্তুদ ঘটনায় আন্তর্জাতিক সমাজের বিবেক যথেষ্টভাবে জাগ্রত হয়নি।

ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ওয়াই বি চ্যাবন জামসেদপুরে বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ভারত সমর্থন করে যাবে। তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে মনে করিয়ে দেন, ভারত এখন আগের থেকে বেশি শক্তিশালী এবং যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত ও সক্ষম।

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব টি এন কাউল কলকাতায় দুই দিনের সফর শেষে বলেন, জাতিসংঘের আগামী সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের শরণার্থী সমস্যাকে ভালোভাবে তুলে ধরা হবে। বাংলাদেশের মানুষের গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধানই কেবল শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে পারে।

সুইডেনে আবু সাঈদ চৌধুরী

সুইডেন সফররত যুক্তরাজ্য ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এদিন সকালে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি মিসেস ইনগ্রিড গার্ডেওয়াইডেমার এবং বিকেলে সুইডিশ পার্লামেন্ট হাউসে লিবারেল পার্টির চিফ হুইপ ইয়ান স্টিফেনসনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করেন। ইয়ান স্টিফেনসন আশ্বাস দেন, লিবারেল পার্টি বাংলাদেশকে সমর্থন করবে। আবু সাঈদ চৌধুরী সুইডেনের খ্যাতনামা সাংবাদিক এবং এক্সপ্রেসেন ইভনিং ডেইলি পত্রিকার সম্পাদক টমাস হ্যামানবার্গের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। হ্যামানবার্গও বাংলাদেশ আন্দোলন সমর্থন করবেন বলে তাঁকে আশ্বাস দেন।

দিল্লিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি কে এম শেহাবউদ্দিন দিল্লি প্রেসক্লাবে বলেন, স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কমনওয়েলথে যোগ দিতে চাইবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের একটা বিরাট অংশ এখন মুক্তিবাহিনীর হাতে। পুরো স্বাধীনতা অর্জনের প্রশ্ন এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব মাহবুবুল আলম চাষী এই দিন দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক কমিটির চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ বিষয়ে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ডি পি ধরের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর সঙ্গে তিনি অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আগামী অধিবেশনে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়ে কথা বলেন। ডি পি ধরের সঙ্গে দেখা করার আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তিনি এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

মাহবুবুল আলম চাষীর অযাচিত দিল্লি সফর ভারতের নীতিনির্ধারণী মহলে যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক করে। কারণ, ইতিমধ্যে ভারতের গোয়েন্দারা জেনে ফেলছিল, খন্দকার মোশতাক আহমদ, চাষী এবং তাঁদের আরও কয়েকজন সহযোগী বাংলাদেশ সরকারের অগোচরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ রক্ষা করে চলেছেন। অন্যদিকে খন্দকার মোশতাক সরকারকে না জানিয়ে তাঁকে দিল্লি পাঠিয়েছেন।

ওমেগার সদস্যরা আটক

ঢাকায় নিয়োজিত যুক্তরাজ্যের ডেপুটি হাইকমিশনারের সূত্রে এদিন জানা যায়, অপারেশন ওমেগার চার সদস্যকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আটক করেছে। তাঁরা যশোর জেলে বন্দী আছেন। ৫ সেপ্টেম্বর তাঁরা ভারতের পেট্রাপোল দিয়ে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে ঢোকেন।

অপারেশন ওমেগা দলের সংগঠক রজার সোদি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় সাংবাদিকদের জানান, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁদের কাছে পাঠানো বার্তায় জানিয়েছে, অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে ওমেগা দলের চার সদস্যের বিচার হবে। তিনি বলেন, ওমেগা দলের সদস্যদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে অপারেশন ওমেগার সমর্থকেরা লন্ডনে পাকিস্তান হাইকমিশনের সামনে ৯ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ করবেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পাকিস্তানি দূতাবাসের সামনেও বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হবে।

গেরিলা অভিযান

১ নম্বর সেক্টরে গেরিলা যোদ্ধারা এদিন চট্টগ্রামে আদালত ভবনে অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানটি চট্টগ্রাম শহরে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই অভিযানের খবর প্রচার করে। খবরে বলা হয়, চট্টগ্রামে আদালত ভবনের তিনতলায় একটি টাইমবোমার বিস্ফোরণে কয়েকজন হতাহত হয়। তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা কুমিল্লার সেনেরহাটে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করেন। পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিবাহিনীর সেনেরহাট অবস্থানের ওপর তীব্র আক্রমণ করলে মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা আক্রমণ চালান। সারা দিন ব্যাপক যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। মুক্তিবাহিনীর কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ ও আহত হন।

৮ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি দল যশোরের সদর থানায় পাকিস্তানি বাহিনীর বারিনগর ক্যাম্প আক্রমণ করে। এতে বেশ কয়েকজন রাজাকার হতাহত হয়।

মুক্তিবাহিনীর হেডকোয়ার্টারের গণসংযোগ বিভাগের যুদ্ধ বুলেটিনে বলা হয়, বিভিন্ন সেক্টরের যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী এদিন ১১৯ জন শত্রুসেনাকে হত্যা করেছে।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ছয় ও আট; মূলধারা ’৭১, মঈদুল হাসান, ইউপিএল, ঢাকা; স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি, আবদুল মতিন, র‌্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকসেন্স, লন্ডন; পূর্বদেশ, ঢাকা, ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা ও যুগান্তর, কলকাতা, ভারত, ৯, ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান