default-image

২৫ মার্চের গণহত্যা আর ২৬ ও ২৭ মার্চের উপর্যুপরি স্বাধীনতার ঘোষণার যুগপৎ প্রভাব এই দিনে লক্ষ্য করা যায়। মানুষের মনের গভীরে অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুভীতি। ২৮ মার্চ ঢাকায় সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সান্ধ্য আইন শিথিল করা হয়। হাজার হাজার সন্ত্রস্ত মানুষ আগের দিনের মতোই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শহর ছাড়তে শুরু করে। এর পাশাপাশি দেশের নানা স্থানে বাঙালিরা পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালায়। এই দিনেও শহরের রাস্তার পাশে পড়ে ছিল নিহতদের লাশ।

রাতে চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের জন্য আবারও বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

পাকিস্তানি নৌবাহিনী চট্টগ্রামের নানা অঞ্চলে এই দিন প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ করে। শুভপুর ব্রিজে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সারাদিন যুদ্ধ চলে। পাকিস্তানিরা বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। নৌবন্দর এলাকায় পাকিস্তানি নৌবাহিনী বাঙালি নৌসেনাদের নিরস্ত্র করে হত্যা করে।

পিটিআই জানায়, নিউইয়র্কে বাঙালিরা পাকিস্তানের কনস্যুলেট জেনারেলের অফিস দখল করে নিয়েছে। পাকিস্তানের কনস্যুলেট ও জাতিসংঘের মিশন ছিল পাশাপাশি বাড়িতে। জাতিসংঘে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত বাঙালিদের প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হন।

পাকিস্তানে মুসলিম লীগের সভাপতি খান আবদুল কাইয়ুম খান গণহত্যার সাফাই গেয়ে বলেন, আওয়ামী লীগের ছয় দফা ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মসূচি এবং সুস্পষ্টভাবে দেশদ্রোহী প্রস্তাব। ঢাকা সম্প্রতি যা ঘটেছে তা উন্মুক্ত বিদ্রোহ। সামরিক বাহিনীর পদক্ষেপ অত্যন্ত সঠিক, সময়োপযোগী ও ন্যায়সংগত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল

জয়দেবপুরে মেজর কে এম সফিউল্লাহর (বীর উত্তম, পর মেজর জেনারেল, সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রদূত ও সাংসদ) নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনাকর্মকর্তা ও সৈনিকেরা ২৮ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন বাঙালি লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী রকিব উদ্দিন। অধিনায়ক হিসেবে তিনি যোগ দিয়েছিলেন ২৫ মার্চ। কে এম সফিউল্লাহ ছিলেন উপ–অধিনায়ক। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে কে এম সফিউল্লাহ তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। কাজী রকিব শেষ অব্দি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি, কিন্তু যোগ না দিয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মরক্ষাও করতে পারেননি। পাকিস্তানিরা তাঁকে আটক ও হত্যা করে।

কে এম সফিউল্লাহরা ময়মনসিংহে ব্যাটালিয়ন সমাবেশের পরিকল্পনা করেন, যাতে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা যায়। সে জন্য তাঁরা একটি লোকদেখানো পরিকল্পনা নেন। অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর ছলে সৈনিক এবং উদ্বৃত্ত অস্ত্রসহ সামরিক সম্ভার তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে যান। পেছনে রেখে যান জয়দেবপুরে মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরীর (বীর বিক্রম, পরে মেজর জেনারেল, রাষ্ট্রদূত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা) ডেল্টা কোম্পানি, গাজীপুরে মেজর আমজাদ লতিফের ব্র্যাভো কোম্পানি এবং রাজেন্দ্রপুরে আলফা কোম্পানির একটি প্ল্যাটুন। রাতে ময়মনসিংহে গিয়ে আবার একত্র হওয়ার জন্য রেখে যাওয়া সৈন্যদের গোপন নির্দেশ দেওয়া হয়।

ময়মনসিংহে পাকিস্তানি সেনারা পরাস্ত

ময়মনসিংহের ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) শাখার বাঙালি সেনারা এই দিন বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। আগের দিন সহকারী উইং কমান্ডার পশ্চিম পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন কামার আব্বাস বাঙালি সেনাদের বিশ্রাম করার নির্দেশ দিয়ে সব পশ্চিম পাকিস্তানি ও অবাঙালি সেনাদের দায়িত্ব দেন। এটি বাঙালি সেনাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। তারা অস্ত্র জমা না দিয়েই ব্যারাকে ঘুমাতে যান।

গভীর রাতে, ঘড়ির কাঁটায় যখন ২৮ মার্চ, পাকিস্তানি ও অবাঙালি সেনারা নিঃশব্দে তাদের অস্ত্রশস্ত্র সদর দপ্তরের ছাদে নিয়ে এসে জড়ো করে এবং যানবাহনের হেডলাইট বাঙালিদের ব্যারাকের দিকে মুখ করে রাখে। মাঝরাতে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের হাতে একসঙ্গে অস্ত্র গর্জে ওঠে।

বাঙালি সেনারা আগে থেকেই অস্ত্র নিয়ে ছিল সতর্ক অবস্থায় ছিল। দ্রুত অবস্থান নিয়ে তারাও প্রত্যুত্তর দেয়। দুই পক্ষে প্রচণ্ড গোলাগুলি চলে। রাত পেরিয়ে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলতে থাকে। বাঙালি সেনাদের অদম্য সাহসিকতায় পাকিস্তানি সেনাদের ছয়জন আটক ও বাকিরা নিহত হয়।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে: ভুট্টো

ঢাকা থেকে করাচি বিমানবন্দরে নেমে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, আল্লার মেহেরবানীতে পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে। এর বেশি কিছু এখন তিনি বলবেন না। পিপিপির করাচির দপ্তরে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন। পিপিপির অন্য সদস্যরাও ভুট্টোর সঙ্গে করাচি ফেরেন।

পিপিপির করাচির দপ্তরে সাংবাদিক সম্মেলনে ভুট্টো বলেন, শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীন ফ্যাসিস্ট ও বর্ণবৈষম্যবাদী সরকার কায়েম করতে চেয়েছিলেন।

সূত্র:বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড;মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ, কে এম সফিউল্লাহ, আগামী প্রকাশনী;দৈনিক পাকিস্তান, ৩১ মার্চ ১৯৭১,আনন্দবাজার পত্রিকা, ভারত এবংডন, পাকিস্তান, ২৯ মার্চ ১৯৭১