default-image

মস্কো ও দিল্লির কূটনীতিকেরা ২৯ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দুই দিন আলোচনার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের অভিমতের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। এর প্রতিফলন দেখা গেছে তাঁদের যুক্ত বিবৃতিতে এবং ভারতীয় সাংবাদিকদের কাছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলেক্স কোসিগিনের মন্তব্যে।

ইশতেহারে দেখা যায়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে লেখা সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পদগোর্নির আগের চিঠির বক্তব্য থেকে দেশটি সুস্পষ্টভাবে সরে এসেছে। পশ্চিম পাকিস্তানের জঙ্গি শাসকেরা বাংলাদেশের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর লেখা সে চিঠিতে পদগোর্নি পাকিস্তানের জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছিলেন। সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ এখন পূর্ব বাংলার জনগণের ইচ্ছা, অধিকার এবং ন্যায়সংগত স্বার্থের প্রতি যথাযথ মর্যাদা দেখিয়ে রাজনৈতিক সমাধান চায়। যুক্ত ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য এতে ‘পূর্ব বাংলা’ শব্দের ব্যবহার।

ইন্দিরা গান্ধীর সফর শেষে এই যুক্ত বিবৃতিতে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক মীমাংসার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, পূর্ববঙ্গের জনগণের আইনসংগত অধিকার রক্ষা এবং শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এ মীমাংসা একান্ত জরুরি।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আলেক ডগলাস হোম এই দিন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্তের ওপর বিশ্ব উদ্বেগের সঙ্গে নজর রাখছে। এই পরিস্থিতি দুটি দেশকেই তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে। পাকিস্তানের সমস্যার ফলে শরণার্থী সংকটের কারণে ভারতের ওপর তীব্র অর্থনৈতিক চাপ পড়েছে। পূর্ববঙ্গেও দুর্ভিক্ষের অবস্থা বিরাজ করছে। সেখানেও ব্যাপক হারে সাহায্য প্রয়োজন।

ব্রিটেনের লেবার পার্টির সচিব টিম রিড আউট দলটির অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে যোগ দিতে যুক্তরাজ্য ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে ২৯ সেপ্টেম্বর একটি চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ জানান।

ব্রিটেনের দ্য টাইমসইন্টারন্যাশনাল হেরান্ড ট্রিবিউন পত্রিকায় এ দিন রাওয়ালপিন্ডি থেকে পাওয়া খবরে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আনা দেশদ্রোহের মামলায় বাদীপক্ষের ২০ জন সাক্ষীর জেরা শেষ হয়েছে। ১১ আগস্ট সামরিক আদালতে বিচার শুরু হওয়ার পর ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আদালতের কাজ মুলতবি রাখা হয়। ইয়াহিয়ার সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক ঘোষণায় বলা হয়, আদালতের কাজ অব্যাহত রয়েছে। যথাসময়ে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হবে।

পাকিস্তানে তৎপরতা

পাকিস্তানের সরকারনিয়ন্ত্রিত পত্রিকা পাকিস্তান টাইমস–এ এই দিন ইয়াহিয়ার প্রস্তাবিত সংবিধানের একটি খসড়া প্রকাশ করা হয়। খসড়ায় পূর্ব পাকিস্তানকে তিনটি আলাদা প্রদেশে ভাগ করার কথা বলা হয়। প্রস্তাবিত সংবিধানে হিন্দুদের ভোটাধিকার রাখা হয়নি।

একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশে লোকসংখ্যা কমিয়ে দেখানোর জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী—এই তিনটি বিভাগ নিয়ে তিনটি আলাদা প্রদেশ এবং তিনটি আলাদা আইনসভা থাকবে। বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগের নামে বা বেনামে কেউ কোনো দিন নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবে না।

ব্রিটেনের দুই সদস্যের একটি সংসদীয় প্রতিনিধিদল অবরুদ্ধ বাংলাদেশ অবস্থা সমীক্ষার জন্য এ দিন ঢাকায় পৌঁছায়। তাঁদের একজন কনজারভেটিভ পার্টির, অন্যজন লেবার পার্টির।

বিজ্ঞাপন

গেরিলা অভিযান

এদিন ভোরে চট্টগ্রামের পূর্ব মধুপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর তিনটি সামরিক যান ১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশে পড়ে এবং দুটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সেক্টরের অন্য দুটি গেরিলা দল রাত প্রায় ১১টায় বল্লভপুর ও ছাগলনাইয়ায় পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানে আক্রমণ করে। এ আক্রমণে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ ইউনিট সহায়তা করে। ছাগলনাইয়ায় কয়েকজন হতাহত হয়।

২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা সন্ধ্যা সাতটার দিকে পাকিস্তানি সেনাদের নয়ানপুর অবস্থানে অতর্কিতে আক্রমণ করেন। এতেও ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনী সহায়তা করে। যুদ্ধে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত এবং ছয়জন বন্দী হয়। পাকিস্তানি সেনারা পাশের অবস্থান থেকে আরও সৈন্য এনে পাল্টা আক্রমণ চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা তা মোকাবিলা করার পর একপর্যায়ে সরে আসেন। যুদ্ধে ১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং ১১ জন আহত হন। যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের রসদ বহনকারী একটি ট্রলি মুন্সীরহাট থেকে বেলুনিয়ার দিকে যাওয়ার পথে গেরিলাদের মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই সেক্টরের ঢাকার নবাবগঞ্জ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দলের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। তিনবার অভিযানে ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা বড় খাল এবং আড়িয়ল বিল হয়ে তিন দিক থেকে আক্রমণ করলে মুক্তিযোদ্ধারা তা প্রতিহত করেন।

বগুড়া-সান্তাহার রেলপথের শরৎপুর স্টেশনের কাছে রেললাইনে ভোররাতে ৭ নম্বর সেক্টরের গেরিলাদের পেতে রাখা মাইনের বিস্ফোরণে সেনা ও রাজাকারবাহী একটি ট্রেনের আংশিক ক্ষতি হয়।

১১ নম্বর সেক্টরের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা ময়মনসিংহের ভালুকায় পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে অতর্কিতে হামলা করলে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার হতাহত হয়।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, দশম খণ্ড; ইন্টারন্যাশনাল হেরান্ড ট্রিবিউনদ্য টাইমস, যুক্তরাজ্য, ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১; দৈনিক পাকিস্তান, ঢাকা, ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকাযুগান্তর, কলকাতা, ভারত, ৩০ সেপ্টেম্বর ও ২ অক্টোবর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান