default-image

সোভিয়েত সাংবাদিক ইউনিয়ন ২ অক্টোবর এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে পাকিস্তানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়। তারা একই সঙ্গে গণহত্যা বন্ধ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার বন্ধ করার দাবি জানায়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশ্ব জানে যে শেখ মুজিব পাকিস্তানের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। আওয়ামী লীগ বিগত সাধারণ নির্বাচনে বিপুল জয়লাভ করে জাতীয় আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

ভারত-সোভিয়েত যৌথ বিবৃতির সমালোচনা

সিপিএম পলিটব্যুরো এ দিন এক বিবৃতিতে সাম্প্রতিক সোভিয়েত-ভারত যৌথ বিবৃতির সমালোচনা করে বলে, এটি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। আশা করা গিয়েছিল, সোভিয়েত-ভারত চুক্তির পর বাংলাদেশ সরকারকে ভারত স্বীকৃতি দেওয়ার সাহস পাবে। কিন্তু তা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

নিখিল ভারত সমাজবাদী দলের চেয়ারম্যান কর্পুরী ঠাকুর এক বিবৃতিতে বলেন, ভারত-সোভিয়েত যৌথ বিবৃতি থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রশ্নটিকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে ইন্দিরা গান্ধীর উচ্চপর্যায়ের আলোচনা আবার প্রমাণ করল যে ভারত বিশ্বশক্তির ক্রীড়নক হয়ে দেশের লোকের আস্থার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (দেবেন সিকদার), শ্রমিক-কৃষক কর্মী সংঘ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (হাতিয়ার গোষ্ঠী) এবং অন্য গণসংগঠনের সমন্বয়ে গড়া বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি এক বিবৃতিতে ভারত-সোভিয়েত যুক্ত বিবৃতিকে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ওপর এক প্রচণ্ড ধাক্কা বলে বর্ণনা করে। কমিটি মনে করে, বিবৃতিতে রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছানোর জন্য যে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা জল্লাদ ইয়াহিয়া খানের কাছে সরাসরি আবেদন ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধরনের মীমাংসা হতে দিলে বাংলাদেশের মুক্তির মূল উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়ে যাবে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার আন্তরিক ইচ্ছা ভারতের নেই।

ভারত পাকিস্তানের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সমুদ্রে ভয় দেখাচ্ছে বলে পাকিস্তান ১ অক্টোবর যে অভিযোগ করে, ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ দিন তা অস্বীকার করে।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশংসা ওসমানীর

বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল এম এ জি ওসমানী বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল সফর করে মুজিবনগরে ফিরে ২ অক্টোবর সাংবাদিকদের বলেন, বাঙালি যুদ্ধ জানে না বলে যে প্রচার ছিল, মুক্তিসেনারা গত ছয় মাসে তাদের সাহসিকতা দিয়ে তা ভুল প্রমাণ করেছে।

বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা এ দিন পররাষ্ট্রসচিব মাহবুবুল আলম চাষীর কাছ থেকে সাম্প্রতিক সোভিয়েত-ভারত আলোচনা সম্পর্কে শোনে।

১ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা এ দিন ফেনী জেলার ছাগলনাইয়ার চম্পকনগর সীমান্তঘাঁটিতে আবার হামলা করলে সেখানে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের কয়েকজন হতাহত হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধাও আহত হন। লক্ষ্মীপুর জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি দল রামগঞ্জ ও পানিয়ালার রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ করলে কয়েকজন হতাহত হয়।

কুমিল্লার হোমনায় ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসিক অভিযানে কয়েকজন পুলিশ ও রাজাকার নিহত হয়।

৭ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা ঠাকুরগাঁওয়ে একটি সড়কে মাইন পেতে রাখে। সে মাইন বিস্ফোরণে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি খাদ্যবাহী ট্রাক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ময়মনসিংহের ফুলপুর-হালুয়াঘাট সড়কে ১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের পুঁতে রাখা মাইনের বিস্ফোরণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি সাঁজোয়া যান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়, মুক্তিযোদ্ধারা এ দিন যশোর, কুমিল্লা-ফেনী ও সিলেট অঞ্চলে সীমান্ত এলাকার ১৭টি স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালান। এসব হামলায় বহু পাকিস্তানি সেনা হতাহত এবং প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র দখল করা হয়।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, দশম খণ্ড; ইত্তেফাক, ঢাকা, ৩ অক্টোবর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত ২ ও ৪ অক্টোবর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন