default-image

মুজিবনগর ও পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় ২৩ সেপ্টেম্বর সরকারি সূত্র জানায়, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয় রাজ্যের শরণার্থীশিবিরগুলোতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং ভারতবিরোধী প্রচারণায় বাংলাদেশ সরকার ও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার উদ্বিগ্ন। এ বিষয়ে মুজিবনগর ও কলকাতার সরকারি সূত্রে জানা যায়, কোনো কোনো বিদেশি রাষ্ট্র পাকিস্তানের হয়ে ভারতীয়দের মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে যে শরণার্থীদের দুর্দশার জন্য আওয়ামী লীগ ও ভারত দায়ী। কয়েকটি সেবাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশি চরের সংস্থাগুলো নানা কার্যক্রমের আড়ালে শরণার্থীদের অর্থের প্রলোভন দেখাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার এই অপপ্রচার রোধে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদের শরণার্থীশিবিরে পাঠিয়ে পাল্টা প্রচারণা চালাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই অপপ্রচার রোধে প্রয়োজনে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করতে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলোকে জরুরি নির্দেশ দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের একজন মুখপাত্র জানান, পশ্চিমবঙ্গের শিবিরগুলোতে অপপ্রচার বন্ধ করা এবং শরণার্থীদের সঙ্গে সরকারের বিনা অনুমতিতে সন্দেহভাজন বিদেশিদের মেলামেশা বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

দিল্লির পাকিস্তানি হাইকমিশনের বাঙালি কর্মী এস এম নুরুল হুদা এ দিন পাকিস্তানি পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের আনুগত্য ঘোষণা করেন। তাঁকে নিয়ে এ পর্যন্ত দিল্লির পাকিস্তানি হাইকমিশনের ছয়জন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেন। তাঁদের মধ্যে দুজন কূটনীতিক।

জাতিসংঘে কথা বলবেন ডগলাস হোম

যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের বক্তৃতায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আলেক ডগলাস হোম বলেন, আসন্ন নিউইয়র্ক সফরকালে তিনি জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে পাকিস্তানের সংকটজনক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন। তাঁর বক্তৃতার প্রচ্ছন্ন সুর এই ছিল যে জাতিসংঘের অধিবেশনে আলোচনাকালে তিনি বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানে বিশেষ গুরুত্ব দেবেন।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিংয়ের দেওয়া এক ভোজসভায় বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। ভোজসভায় জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট, সাধারণ পরিষদের সভাপতি ইন্দোনেশিয়ার আদম মালিক, সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকোসহ ৩৫ জন উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের শরণার্থীসংক্রান্ত উপকমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি সিনেটে বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য একটা বিল পেশ করেন। বিলে ভারতে আসা বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য ৩০০ কোটি ভারতীয় মুদ্রার সাহায্যের প্রস্তাব করা হয়। সিনেটর কেনেডি বলেন, ইতিহাসের পাতায় বাংলাদেশের এই ঘটনা মানবজাতির ভাগ্যে সবচেয়ে কলঙ্কময় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হবে।

ইন্দিরা গান্ধীর সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের প্রস্তুতির জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী কমিটির চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ বিষয়ে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ডি পি ধর এ দিন মস্কো যান। ডি পি ধর মস্কো পৌঁছেই সোভিয়েত সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোলাই ফিরুবিনের সঙ্গে বৈঠক করেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী ভিয়েতনামের কনসাল জেনারেল গুয়েন অ্যান ভু এই দিন জলন্ধরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি ভিয়েতনাম সরকারের পূর্ণ সমর্থন আছে।

গেরিলা অভিযান

২ নম্বর সেক্টরের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা এ দিন ঢাকার দুটি জায়গায় অভিযান পরিচালনা করেন। একটি দল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের নেতা এবং পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি মাহমুদ আলীর ঢাকার বাসভবন আক্রমণ করে। এরপর মাহমুদ আলীর পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নেয়। অন্য গেরিলা দলটি পাকিস্তান ও সামরিক সরকারের গোঁড়া সমর্থক অধ্যাপক দীন মোহাম্মদের বাসভবনে হামলা চালায়। গেরিলাদের আক্রমণে বাড়ি দুটির ক্ষয়ক্ষতি হলেও কেউ হতাহত হননি।

এই সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি দল মর্টার ও রকেট লাঞ্চারের সাহায্যে পাকিস্তানি বাহিনীর গোবিন্দমাণিক্য দিঘীর অবস্থানে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে পাকিস্তানিদের কয়েকটি বাংকার ক্ষতিগ্রস্ত এবং কয়েকজন হতাহত হয়। অন্য আরেক দল মুক্তিযোদ্ধা মানিকগঞ্জের দৌলতপুর থানায় আক্রমণ করে কয়েকজন পুলিশ ও রাজাকারকে বন্দী এবং অনেক অস্ত্রশস্ত্র দখল করেন।

অবরুদ্ধ বাংলাদেশে পাকিস্তানি অনুগত গভর্নর ডা. আবদুল মোত্তালিব মালিকের মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্বাস আলী খানের সঙ্গে এম আর এ রেজভীর নেতৃত্বে মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও পুরান ঢাকার বিহারি নেতারা সাক্ষাৎ করেন।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই; দ্য গার্ডিয়ান, লন্ডন, যুক্তরাজ্য, ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১; ইত্তেফাকপূর্বদেশ, ঢাকা, ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকাযুগান্তর, কলকাতা, ভারত, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন