default-image

নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে ১৬ এপ্রিল অত্যন্ত ব্যস্ত দিন কাটে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম সন্ধ্যায় কলকাতা প্রেসক্লাবে গিয়ে সাংবাদিকদের জানান, পরের দিন বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষ্ঠান রয়েছে। যাঁরা অনুষ্ঠানে যেতে চান, তাঁদের অবশ্যই ভোরে প্রেসক্লাবে উপস্থিত থাকতে হবে। বাংলাদেশ সরকার তাঁদের গাড়ি দিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাপনা করবে।

ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র এই দিনে একটি প্রতিবাদপত্র প্রকাশ করেন। তাতে বলা হয়, পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে যে পৈশাচিক হত্যালীলা চালাচ্ছে, তা থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে ভারতের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণায় নেমেছে। প্রতিবাদপত্রটি তিনি উপস্থিত বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেন।

বাংলাদেশকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে ভারতের এক্সপ্লোরার ক্লাব গণস্বাক্ষর অভিযান করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে পেশ করার জন্য প্রস্তাবিত এই দাবিনামায় চিত্রশিল্পী যামিনী রায় নিজে স্বাক্ষর করে গণস্বাক্ষর অভিযান উদ্বোধন করেন।

বিজ্ঞাপন

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিচারপতি শঙ্করপ্রসাদ মিত্র, বিচারপতি এস এ মাসুদ প্রমুখ এক আবেদনে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুর নির্যাতনের নিন্দা জানান।

কলকাতায় সংগ্রামী স্বাধীন বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির স্টিয়ারিং কমিটির এক সভায় পাকিস্তানকে জাতিসংঘ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এস এন সেন। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।

কলকাতায় অল ইন্ডিয়া মাওলানা আজাদ সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার মিশনের পশ্চিমবঙ্গ মোতাওয়াল্লি সম্মেলনে মুসলমান নেতারা বাংলাদেশে ধর্মস্থান ও মসজিদের ওপর বোমাবর্ষণের প্রতিবাদ জানান। ভারতের ক্ষুদ্রশিল্প ফেডারেশন বাংলাদেশ তহবিলে সাহায্য দিতে পশ্চিমবঙ্গের সব ক্ষুদ্র শিল্পপতিকে আহ্বান জানায়। কলকাতার শিখ ধর্মাবলম্বীরাও পাকিস্তানি নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।

সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে এই দিন বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তু প্রবেশ করে।

লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। বিশ শতকে এটি একটি বিরল ধরনের মুক্তি আন্দোলন। এ আন্দোলনে মানুষের সমর্থন অকুণ্ঠ, কিন্তু অস্ত্রশস্ত্রের অভাব প্রকট। অথচ কয়েকটি শহরে মুক্তিযোদ্ধারা এখনো প্রশাসন চালিয়ে যাচ্ছেন।

অবরুদ্ধ বাংলাদেশের ভেতরে

খাজা খয়ের উদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ১৬ এপ্রিল কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়। সন্ধ্যায় পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান নুরুল আমিনের নেতৃত্বে শান্তি কমিটির নেতারা গভর্নর টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে জানান, শত্রু নিধনে তাঁরা সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করবেন।

সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকায় কারফিউর মেয়াদ ভোর ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শিথিল করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের অবিলম্বে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

চট্টগ্রামের কুমিরায় যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে সীতাকুণ্ড এসে প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করেছিলেন। অবস্থানটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এর গুরুত্ব ছিল ব্যাপক। পাকিস্তানি সেনারা মিরসরাই যুদ্ধ শেষে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত এগিয়ে আসে। গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে তারা দফায় দফায় হামলা চালায় এবং নৌবাহিনীর কামান থেকে গোলাবর্ষণ করে। মুক্তিসেনারাও পাল্টা আঘাত হানেন।

রাঙামাটির খাগড়া রেস্টহাউসেও পাকিস্তানি সেনাদের ওপর মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালালে পাকিস্তানিদের কয়েকজন হতাহত হয়। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র পুনর্দখল নিয়ে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে দিনভর সংঘর্ষ চলে।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল দিনাজপুরের পার্বতীপুরে ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভবানীপুরের হাওয়া গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে আক্রমণ চালায়। যুদ্ধে আটজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং অনেকে আহত হন। পঞ্চগড় দখলের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর দিনাজপুরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এই দিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে চলে যায়। বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার কর্তৃত্বও তারা নিয়ে নেয়।

কুমিল্লার গঙ্গাসাগর সেতুতে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে প্রবল গুলিবিনিময় হয়। কুমিল্লা-ত্রিপুরা সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা প্রতিহত করে। আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। কসবা সীমান্তে সারা দিন মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ চলে।

চুয়াডাঙ্গায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিমান হামলায় মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সদর দপ্তর সরিয়ে ভৈরব নদের অপর পারে ইছাখালী বিওপিতে স্থানান্তর করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ভেড়ামারার কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়। ময়মনসিংহের দখল নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচার হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ করে।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, দ্বাদশ খণ্ড; বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক, দুই, সাত, আট, এগারো; মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, আমীর-উল ইসলাম, (কাগজ প্রকাশন); দৈনিক পাকিস্তান, ১৭ এপ্রিল ১৯৭১; গার্ডিয়ান, ১৬ এপ্রিল ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান