default-image

স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচারিত আওয়ামী লীগের একটি বক্তব্য ২৭ মে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বিশেষ দূতের প্রস্তাবিত একটি ফর্মুলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একজন মুখপাত্রের বিবৃতি সম্পর্কে আওয়ামী লীগ বলে, বাংলাদেশ এখন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। এ নিয়ে নতুন কোনো আলোচনার সুযোগ নেই। নতুন কোনো আপসের চেষ্টা হলে বাংলাদেশের মানুষ তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করবে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি এই দিন মুক্তিযুদ্ধের জন্য একটি জাতীয় ফ্রন্ট গঠনের আহ্বান জানায়। দলের এক বৈঠকে নেওয়া প্রস্তাবে বলা হয়, আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), কমিউনিস্ট পার্টিসহ সব দেশপ্রেমী শক্তির সমন্বয়ে জাতীয় ফ্রন্ট গড়ে তোলা উচিত। ফ্রন্টের কর্মসূচি থাকবে ন্যূনতম।

কমিটি আরও কয়েকটি প্রস্তাব নেয়। একটি প্রস্তাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দীর মুক্তি দাবি করা হয়। আরেক প্রস্তাবে বাংলাদেশের ব্যাপারে চীনের ভূমিকায় বিস্ময় ও মর্মাহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তারা।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক কামারুজ্জামান আনন্দবাজার পত্রিকাকে এক সাক্ষাৎকারে জানান, বাংলাদেশ থেকে ভারতে
আসা শিক্ষকেরা বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে বিদ্যালয় চালাবেন। সমিতি ওই বিদ্যালয়ে ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পে ১ হাজার ৫০০ শিক্ষককে নিয়োগ এবং তাঁদের ভাতা দেওয়া হবে।

ভারতে বাংলাদেশের পক্ষে

দিল্লির স্থানীয় সরকারি মহল থেকে জানা যায়, পূর্ববঙ্গের (বাংলাদেশ) সঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ ফয়সালার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন (তৎকালীন), ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশ পাকিস্তানকে চাপ দিতে শুরু করেছে। এর মূলে রয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর রাজধানীতে ভারতীয় কূটনীতিকদের তৎপরতা, উপমহাদেশে গুরুতর পরিস্থিতি সম্পর্কে খবর এবং পূর্ব বাংলার সামরিক পরিস্থিতি। তবে যুক্তরাজ্য আলাদা একটি অবস্থান নিয়েছে।

উপমহাদেশের বাইরে

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের শরণার্থীসংক্রান্ত সাব-কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি বাংলাদেশের মানুষ ও ভারতে অবস্থানরত শরণার্থীদের দুর্দশা লাঘবে ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত পক্ষগুলোর পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য নিজ দেশের সরকারের প্রতি আবেদন জানান।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আগা হিলালি ওয়াশিংটনে বলেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যাকে ভারত আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা বাংলাদেশে পাকিস্তানি নৃশংসতা সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে খ্রিষ্টধর্মীয় নেতা রেভারেন্ড জন হ্যাস্টিংস ও রেভারেন্ড জন ক্ল্যাপহামের বিবরণ প্রকাশ করে।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তান ও অবরুদ্ধ বাংলাদেশে

পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ ৫১ নম্বর সামরিক বিধির আওতায় আপত্তিকর বইপত্র, পোস্টার, লিফলেট ইত্যাদি সামরিক দপ্তরে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কর্তৃপক্ষ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। অমান্য করলে শাস্তি হবে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।

মুক্তিবাহিনীর একটি ছোট দল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শালদানদীর সিঅ্যান্ডবি রাস্তার ওপর পাকিস্তানি সেনাদের অ্যামবুশ করে। এতে পাকিস্তানি সেনাদের একটি জিপ ও একটি ট্রাক ক্ষতিগ্রস্ত এবং কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়।

সাতক্ষীরায় ভেড়ামারা বাঁধে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনীর ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি বড় দল দুবার আক্রমণ চালায়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে যায়। দিনব্যাপী যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের বেশ ক্ষতি হয়।

কুড়িগ্রামের পাটেশ্বরীতে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধে ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই ও তিন; পূর্বদেশ ও দৈনিক পাকিস্তান, ২৮ ও ২৯ মে ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকাযুগান্তর, ভারত, ২৮ মে ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান