default-image

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১১ জ্যৈষ্ঠ ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৭২তম জন্মজয়ন্তী। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কবির জন্মদিন যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্‌যাপন করে। কলকাতায় বাংলাদেশ মিশনের সামনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে পাকিস্তানের শাসক চক্রকে উৎখাতের সংকল্প প্রকাশ করা হয়। এর আগে সকালে কলকাতার বাংলাদেশ মিশনের প্রধান এম হোসেন আলী কবিভবনে গিয়ে কবির গলায় মালা পরিয়ে দেন এবং তাঁর সহধর্মিণী কবিকে পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সন্ধ্যায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কবিকে পুষ্পমাল্য পরানো হয়। বাংলাদেশের বহু লেখক, কবি ও সাংবাদিক কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে কবিভবনে যান।

পশ্চিমবঙ্গ নজরুল একাডেমির সহায়তায় বাংলাদেশ মিশনের সামনে সকালে কবিকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান শুরু হয় গণনাট্য সংস্থার শিল্পীদের গাওয়া ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ দিয়ে। শেষ হয় ‘আমার সোনার বাংলা’ দিয়ে, পরিবেশন করেন সন্‌জীদা খাতুন। এ গান পরিবেশনের সময় সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলান। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সাহিত্যিক-সাংবাদিক রণেশ দাশগুপ্ত কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

বিজ্ঞাপন

ভারতে বাংলাদেশের পক্ষে

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই দিন লোকসভায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও ভারতের সীমান্ত রাজ্যগুলোতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণ সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশে যে ভয়ংকর পরিস্থিতি চলছে, তাতে বিশ্বের সব দেশকে এগিয়ে এসে দায়িত্ব না নিলে পরিণাম বিপর্যয়কর হবে। ওই দেশের জনসাধারণের একেবারে বেঁচে থাকার সমস্যাই দেখা দিয়েছে। ঠান্ডা মাথায় সেখানে গণহত্যা চালানো হচ্ছে। নারী, বৃদ্ধ, শিশু—কেউই রেহাই পাচ্ছে না।

ইন্দিরা গান্ধী আরও বলেন, ঘটনাটি ভারত ও সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শান্তির জন্য বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। ঝুঁকি নিতে তাঁর সরকার ভীত নয়। সরকার এই সমস্যাকে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে বিবেচনা করে দেখছে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নটি এই প্রেক্ষাপটেই বিচার করে দেখা হচ্ছে।

ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা দিল্লিতে সাংবাদিকদের জানান, তিন দিন ধরে সীমান্তে অনুপ্রবেশ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হামলার ফলে গুরুতর পরিস্থিতি দেখা দেওয়ায় পূর্বাঞ্চলে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান সংযত না হলে গুরুতর পরিণাম ঘটতে পারে।

ব্রিটেনের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ওয়ার অন ওয়ান্টের দুজন প্রতিনিধি জন হরগান ও রেভারেন্ড ব্রুসকেন্ট সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করে কলকাতায় ফিরে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে আসার আগে পূর্ব পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য তাঁরা অনুমতি চাইলেও সরকার অনুমতি দেয়নি।

বিজ্ঞাপন

উপমহাদেশের বাইরে

জাতিসংঘের এক মুখপাত্র জানান, পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর তাণ্ডবে যারা শরণার্থী হয়েছে, তাদের সবাইকেই সাহায্য দিতে যুক্তরাষ্ট্র রাজি আছে। কীভাবে পূর্ব পাকিস্তানে মানবিক সাহায্য দেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট এবং পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহির মধ্যে গতকাল আলোচনা হয়েছে।

ব্রিটেনের কেন্টের ক্রিকেট মাঠে এই দিন পাকিস্তান ক্রিকেট দল এবং কেন্ট ক্রিকেট দলের মধ্যে তিন দিনব্যাপী খেলার প্রথম দিনের খেলা শুরু হওয়ার পর ৫০-৬০ জন প্রবাসী বাঙালি প্ল্যাকার্ড হাতে খেলার মাঠে নীরব বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাঁরা দর্শকদের মধ্যে প্রচারপত্রও বিলি করেন। প্রতিবাদকারীদের এক নেতা বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে চলমান গণহত্যা বন্ধে ব্রিটেনের মানুষের সমর্থন আদায়ের জন্য তাঁদের এই প্রতিবাদ। পরে কয়েকজন প্রতিবাদকারী মাঠে ঢুকে সাইট স্ক্রিনের সামনে দিয়ে সার বেঁধে হেঁটে যান। এ সময় কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ থাকে।

পাকিস্তান ও অবরুদ্ধ বাংলাদেশে

করাচির চীনা কনস্যুলেট জেনারেল নিয়েই কুন চি বলেন, স্বাধীনতা রক্ষার ন্যায্য সংগ্রামে চীন সব সময় পাকিস্তানকে সমর্থন জানাবে। বৈদেশিক আক্রমণ এবং হস্তক্ষেপ মোকাবিলায় চীন পাকিস্তানিদের পাশে দাঁড়াতে কুণ্ঠাবোধ করবে না।

একটি পাকিস্তানি সেনাদল ২৬ মে দুপরে স্থানীয়দের সহায়তায় সিলেট জেলার ওসমানীনগরের বুরুঙ্গা এবং তার আশপাশের এলাকার মানুষদের বুরুঙ্গা উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে সমবেত করে। সেখান থেকে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের আলাদা করে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে। সেখানে বেঁচে যাওয়া শ্রীনিবাস চক্রবর্তীর মতে, ৯৪ জনের মতো মানুষকে সেদিন হত্যা করা হয়।

একদল মুক্তিযোদ্ধা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথদিঘির পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে আকস্মিক আক্রমণ করলে তাদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় এই দিন পাকিস্তানের সহযোগী ও খুলনার সাবেক এমপিএ আবদুল হামিদ এবং বাগেরহাটের মুসলিম লীগ নেতা আবদুস সাত্তার নিহত হন।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই ও তিন; পূর্বদেশ ও দৈনিক পাকিস্তান, ২৭ ও ২৮ মে ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকাযুগান্তর, ভারত, ২৭ মে ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন