default-image

যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি পাকিস্তানের নিন্দা করে দলের জাতীয় সম্মেলনে গ্রহণের জন্য ৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রস্তাব পেশ করে। প্রস্তাবে বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণের দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগের কারণে পাকিস্তান নিন্দনীয়। কারণ, তারা পূর্ব বাংলার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে।

প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান হতে পারে দুভাবে। প্রথমত, পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের সেনাদের অত্যাচার বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, শেখ মুজিবুর রহমানসহ বাংলাদেশের সব জনপ্রিয় নেতাকে মুক্তি দেওয়া এবং তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা। কারণ, শেখ
মুজিবের আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিপুল জয়লাভ করেছিল। জনগণের ইচ্ছানুযায়ী তাদের গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধানের ব্যবস্থা করার জন্য জাতিসংঘকে প্রত্যক্ষ উদ্যোগ নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্স জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনার কারণে এশিয়ায় বিঘ্নিত শান্তি ফিরিয়ে আনতে তিনটি উদ্যোগের কথা বলেন। ১. উপমহাদেশে সংযম রক্ষা করা; ২. দুর্ভিক্ষ নিবারণ ও শরণার্থীদের দেশে ফেরার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক সাহায্য কর্মসূচি প্রসার করা; ৩. কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করা। উপমহাদেশে শান্তি রক্ষার প্রশ্নে পাকিস্তান ও ভারতকে তিনি সমভাবে দায়ী করেন।

বিজ্ঞাপন

আরেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের আনুগত্য

ভারতের রাজধানী দিল্লির পাকিস্তান হাইকমিশনের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বাঙালি হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ৪ অক্টোবর পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রকাশ করেন। তিনি পাকিস্তান হাইকমিশনের পরামর্শদাতা পদে কর্মরত ছিলেন। এপ্রিল মাসে তাঁকে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা থেকে দিল্লির মিশনে পাঠানো হয়।

দিল্লির পাকিস্তান হাইকমিশনের আরেকজন বাঙালি কর্মী এবং হাইকমিশনের একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সচিব ফরিদউদ্দীন আহমদ সপরিবার হাইকমিশন ভবন ত্যাগ করে বাংলাদেশ মিশনে যোগ দেন। ফরিদউদ্দীন আহমদ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হাইকমিশনের দেয়াল টপকে একটি ট্যাক্সি নিয়ে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ মিশনে যান। এ সময় পাকিস্তান হাইকমিশনের কয়েকজন তাঁর পেছনে ধাওয়া করে। ট্যাক্সিচালকের দক্ষতায় তাঁরা রক্ষা পান।

মুজিবনগরের একটি সূত্র সাংবাদিকদের এ দিন জানায়, বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশ নিয়ে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ হলে চীন পাকিস্তানকে সেনাসাহায্য করবে না। তবে অস্ত্রসহায়তা দেবে। চীন পাকিস্তানকে এখনো অস্ত্রসহায়তা দিচ্ছে। চীনের সবশেষ মনোভাব জানার জন্য বাংলাদেশ সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে।

গেরিলা অভিযান

১ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা সকাল আনুমানিক ১০টায় ফেনীর অন্তর্গত পরশুরামের বিলোনিয়ার কাছাকাছি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী গুতুমা সীমান্তঘাঁটির কাছে পাকিস্তানি অবস্থানে আক্রমণ করলে দুজন সেনা হতাহত হয়।

২ নম্বর সেক্টরের মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। মুক্তিবাহিনীর হালিম বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা সাদাপুরে একটি গোপন উপক্যাম্পে থাকাকালে খবর আসে, পাশের সমসাবাদ গ্রামে সেনা ও রাজাকার সমন্বয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল এসেছে। মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত ওই গ্রামে গিয়ে তাদের আক্রমণ করেন। তাঁদের আকস্মিক আক্রমণে কয়েকজন সেনা ও রাজাকার হতাহত হয়। যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন আহত হন। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পরও তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। চিকিত্সার জন্য চিকিত্সকের কাছে পাঠানোর সময় পথেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য স্বাধীনতার পর সরকার তাঁকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করে।

এই সেক্টরের আরেক দল মুক্তিযোদ্ধা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় পাকিস্তানি বাহিনীর সীমান্তবর্তী অবস্থানে হামলা করলে কয়েকজন হতাহত হয়। তাদের একটি নৌযান ডুবে সমরাস্ত্রেরও ক্ষতি হয়।

বিজ্ঞাপন

মধ্যপ্রদেশের বিধানসভায় বাংলাদেশ

ভারতের মধ্যপ্রদেশ বিধানসভায় এক প্রস্তাবে পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যার নিন্দা এবং বিনা শর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি দাবি করা হয়। জনসংঘ ও সোশ্যালিস্ট পার্টির কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব অগ্রাহ্য করা হলে বিরোধী দলের সদস্যরা সভাকক্ষ ত্যাগ করেন। তাদের দাবি ছিল মূল প্রস্তাবে ভারতের অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের কথাটি জুড়ে দেওয়া হোক।

ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জনজীবন রাম দিল্লিতে বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাধানের মধ্যে বাংলাদেশের নিঃশর্ত স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক ও দুই; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত ৫ ও ৬ অক্টোবর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান