default-image

দুঃসাহসী কিশোর বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক কঠোর সেনা প্রহরা পেরিয়ে ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর আবদুল মোনেম খানের ড্রয়িংরুমে ঢুকে তাঁকে গুলি করেন। গুলিবিদ্ধ মোনেম খান রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। ঘটনাটি প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মোনেম খানের বনানীর বাড়ি পাহারার দায়িত্ব পড়ে বালুচ রেজিমেন্টের একটি দলের ওপর। বাড়ির মুখে বাংকার বানিয়ে তারা পাহারা দিত।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিবাহিনীর ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক তিনবারের চেষ্টায় এ অভিযানে সফল হন। প্রথমবার সন্ধ্যায় বাড়িটিতে ঢোকার পর জানতে পারেন, অসুস্থ মোনেম খান দোতলায় শোবার ঘরে চলে গেছেন। দ্বিতীয় সন্ধ্যায় মোনেম খানের বাসায় ঢুকেও অভিযান পরিচালনা করা যায়নি। ১৩ অক্টোবর তৃতীয় অভিযানে মোজাম্মেল হক সহযোগী হিসেবে সঙ্গে নেন আনোয়ার হোসেনকে। সন্ধ্যার পর মোনেম খানের বাসার ভেতরে কলাবাগানের ঝোপে দুজন লুকিয়ে থাকেন। কিছুক্ষণ পর গুপ্তচর শাজাহান আর মোখলেস এসে জানান, মোনেম খান তাঁর জামাতা জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল এবং শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ হোসেনের সঙ্গে বাসার নিচতলার ড্রয়িংরুমে কথা বলছেন।

মোখলেস আর শাজাহানকে আগে পালাতে দিয়ে মোজাম্মেল হক অভিযান শুরু করেন। ড্রয়িংরুমের দরজায় পৌঁছে তিনি দেখেন, দরজার দিকে ফিরে সোফায় বসে তিনজন কথা বলছেন। ড্রয়িংরুমে ঢুকেই তিনি স্টেনগানের ট্রিগার টেপেন। একটি গুলি বের হয়েই স্টেনগানটি আটকে যায়, কিন্তু গুলিটি মোনেম খানের পেটে বিদ্ধ হলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। বালুচ সেনারা ততক্ষণে গুলি ছুড়তে শুরু করেছে। আনোয়ার পাঁচিল টপকে বাড়ির বাইরে চলে যান। মোজাম্মেলও দ্রুত ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে দেয়াল টপকে বেরিয়ে পড়েন। একসময় পৌঁছে যান বনানী-গুলশান লেকে। অভিযান শেষে এখানেই সবার মিলিত হওয়ার কথা ছিল।

পাকিস্তানি সেনারা এদিন সন্ধ্যায় কসবায় ২ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধার অবস্থানে আক্রমণ করলে মুক্তিযোদ্ধারা দৃঢ়ভাবে তা মোকাবিলা করেন। এক ঘণ্টার এই যুদ্ধে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। মুক্তিবাহিনীর দুজন শহীদ এবং একজন আহত হন।

ঐক্যের আহ্বান তাজউদ্দীনের

বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিবাহিনীর ৬ নম্বর সেক্টরের দিনাজপুর অঞ্চলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। চূড়ান্ত বিজয় না আসা পর্যন্ত এ সংগ্রাম চলবে। তিনি বলেন, জাতীয় সংকটে রাজনৈতিক দলাদলি শত্রুর হাতকেই শক্তিশালী করে। বাংলাদেশের স্বার্থে সবাইকে তিনি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

ইয়াহিয়ার সমালোচনায় ‘ডন’

পাকিস্তানের করাচি থেকে প্রকাশিত ডন পত্রিকায় ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, পাকিস্তানের পুনর্গঠিত জাতীয় পরিষদ যে সংবিধানই প্রণয়ন করুক না কেন, তা গণতান্ত্রিক হবে না। কারণ, তার পেছনে জনগণের রায় নেই। আগামী ডিসেম্বরে আয়োজিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তান সংখ্যালঘুতে পর্যবসিত হবে, অথচ পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় তারা সংখ্যাগুরু।

ডন আরও বলে, ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের ৮৮ জন সদস্যের সদস্যপদ বহাল রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৫-২০ জন সদস্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। পরিষদের অধিবেশন শুরু হলে অন্তত ৭০টি আসন শূন্য থাকবে। ওই আসনগুলো শূন্য রেখে অধিবেশন চালালে জাতীয় পরিষদের কোনো গুরুত্বই থাকবে না। কাজেই এ সংবিধান গণতন্ত্রসম্মত হবে না।

বিজ্ঞাপন

ভারতকে সোভিয়েত ইউনিয়নের আশ্বাস

সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত আলোচনার ধারাবাহিকতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন এদিন আবারও এই আশ্বাস দেয় যে তাদের বাংলাদেশ নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে। আগের সপ্তাহে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আলজেরিয়ার যুক্ত ইশতেহার নিয়ে সৃষ্টি হওয়া বিভ্রান্তির প্রেক্ষাপটে নতুন করে এ আশ্বাসের গুরুত্ব অনুভূত হয়। ওই যুক্ত ইশতেহারের একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, দক্ষিণ এশিয়া পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পাকিস্তান ও ভারতের জাতীয় সংহতি ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি উভয় দেশ সম্মান প্রদর্শন করছে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জন্য উভয় দেশকে আহ্বান জানাচ্ছে। সোভিয়েত কর্মকর্তারা বলেন, সোভিয়েত-ভারত চুক্তিই প্রমাণ করে যে ভারত ও পাকিস্তানকে তাঁরা কখনো এক আসনে বসাবে না।

জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে বলেন, ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা প্রশমনের একমাত্র উপায় বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানে পাকিস্তানের এগিয়ে আসা। বাংলাদেশের জনগণের ওপর সামরিক নিপীড়ন চালানোর কারণে পাকিস্তানে উদ্ভূত ভয়াবহ সংকট নিরসনে আপস করা ছাড়া পাকিস্তানের গত্যন্তর নেই।

ভারতে আসবেন আঁদ্রে মালরো

বার্তা সংস্থা এএফপি ১৩ অক্টোবর জানায়, ফ্রান্সের সাবেক মন্ত্রী ও ভাবুক আঁদ্রে মালরো ভারতে এসে ১৫ নভেম্বরের পর থেকে ভারতেই থাকবেন। তবে ভারতে যাওয়ার আগে নভেম্বরে ইন্দিরা গান্ধীর প্যারিস সফরকালে তিনি তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এবং তাঁর ভারতে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করবেন।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, খণ্ড দশ ও এগারো; ইত্তেফাক, মোজাম্মেল হক বীর প্রতীকের সাক্ষাৎকার, ২০১০; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত ১৪, ১৫ ও ১৮ অক্টোবর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান