default-image

দিনাজপুর অঞ্চলের হিলিতে পাকিস্তানি বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি মুক্ত করার জন্য মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বিত আক্রমণ ২৭ নভেম্বর তীব্র আকার ধারণ করে। হিলিতে তীব্র লড়াই হয়। রংপুর সেনানিবাস থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলাকে বিচ্ছিন্ন করতে যৌথ বাহিনী তিন দিক থেকে আক্রমণ চালায়। তাদের কামানের গোলায় পাকিস্তানিদের পাঁচটি ট্যাংক বিধ্বস্ত হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ৮০ জন হতাহত হয়। যৌথ বাহিনীরও ২০ জন হতাহত হন।

সিলেট অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটি রাধানগর কমপ্লেক্স মুক্ত করার জন্য এদিনও থেমে থেমে যুদ্ধ চলে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৫/৫ গোর্খা রেজিমেন্ট পাকিস্তানি বাহিনীর রাধানগর ও ছোটখেল অবস্থানে আক্রমণ করে। ছোটখেলে তাদের সঙ্গে ছিল জেড ফোর্সের ৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ডেল্টা কোম্পানির একটি প্লাটুন। নেতৃত্বে ছিলেন ডেল্টা কোম্পানির অধিনায়ক এস আই এম নুরুন্নবী খান (স্বাধীনতার পর বীর বিক্রম ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল)। তাদের দায়িত্ব ছিল গোর্খা সেনাদের বেরোনোর পথ নিরাপদ রাখা এবং দক্ষিণ দিকের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করা।

আর্টিলারির গোলাবর্ষণের পর গোর্খা রেজিমেন্টের সেনারা সরাসরি আক্রমণ শুরু করেন। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর তাঁরা ছোটখেল দখল করেন। গোর্খা রেজিমেন্টের অন্য যে দুটি কোম্পানি রাধানগরে আক্রমণ করেছিল, তারা লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। তাদের ৪ জন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পদের ৬৭ জন সেনা শহীদ হন। আহত হন শতাধিক।

ছোটখেল দখল করলেও পুনঃসংগঠিত পাকিস্তানি সেনাদের হামলায় তা গোর্খা সেনাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। গোর্খা সেনারা নুরুন্নবী খানের প্লাটুনের সহায়তায় পিছু সরে আসেন। শহীদ হন ৩৬ জন।

নুরুন্নবী খানের অধীন ডেল্টা কোম্পানির অবস্থান ছিল লুনি, দুয়ারীখেল, গোরা, ছাত্তারগাঁ ও শিমুলতলা গ্রামে। পাকিস্তানিরা এসব অবস্থানে আকস্মিক আক্রমণ করে। প্রথমে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ করতে হিমশিম খান। পরে কিছুটা ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে প্রতিহত করেন।

সিলেট অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর আরেকটি দল রহিমপুরের কাছে বিরাট এলাকা মুক্ত করে। দুজন কর্মকর্তাসহ ২৩ জন পাকিস্তান সেনা বন্দী হয়। ১৮৩ জন রাজাকার আত্মসমর্পণ করে।

ফেনী দখলের জন্য মুক্তিবাহিনী ভারতীয় বাহিনীর সহায়তায় তিন দিক থেকে আক্রমণ চালায়। স্থলযুদ্ধে মার খেয়ে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী বোমা বর্ষণ করে। তবে মুক্তিবাহিনী অবস্থান ধরে রাখে।

৭ নম্বর সেক্টরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে তিন মাইল দূরে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানে মুক্তিবাহিনী মর্টার ও মেশিনগান নিয়ে আক্রমণ চালায়। এতে পাকিস্তানি বাহিনীর কয়েকটি বাংকার ধ্বংস এবং কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার নিহত হয়। এই সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি দল একসঙ্গে পোড়াগ্রাম আক্রমণ করলে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার নিহত হয়।

বাজপেয়ীর সমর্থন

জনসংঘের সভাপতি অটল বিহারি বাজপেয়ী এদিন বলেন, ভারতের ওপর পাকিস্তান যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে জনসংঘ সরকারের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানাবে।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে আফ্রো-এশিয়া সংহতি কমিটির এশীয় আঞ্চলিক উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ১৯৭২ সালের ১০ থেকে ১৫ জানুয়ারি মিসরের রাজধানী কায়রোয় অনুষ্ঠেয় পঞ্চম অধিবেশনে বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে তারা আলোচনা করবে। সে অধিবেশনে যাতে বাংলাদেশ যোগ দিতে পারে, তার জন্য কায়রো অধিবেশনের প্রস্তুতি কমিটিকে জানানো হবে।

ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের একটি সূত্র এদিন জানায়, নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন ডাকতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ টেলিফোনে কথা বলেছেন। নিয়মমতো আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিপন্ন হলেই নিরাপত্তা পরিষদ মাথা ঘামাতে পারে। বর্তমান সংকটে পাকিস্তান যাতে ভেঙে না যায়, সে উপায় খুঁজে বের করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদ আলোচনা করতে পারে।

তবে ভারত-পাকিস্তান সংকটে নিরাপত্তা পরিষদের এগিয়ে আসার জন্য প্রচেষ্টা নেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র অস্বীকার করে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, বাংলাদেশ সমস্যাকে পাকিস্তান ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পরিণত করতে এবং নিরাপত্তা পরিষদকে এতে টেনে আনতে চাইছে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি তাদের ঢাকা সংবাদদাতার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানায়, ঢাকায় আবার কয়েকটি বিস্ফোরণের এবং কয়েকটি পেট্রলপাম্প উড়িয়ে দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সড়ক, জলপথ ও রেল পরিবহন বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পরিখা খনন করা হচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক সংবাদপত্র দং এ লিবো এদিন জানায়, উত্তর কোরিয়া পাকিস্তানে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র পাঠিয়েছে। অস্ত্রবোঝাই একটি জাহাজ পাকিস্তানে পাঠানোর খবর সরকারিভাবে সমর্থিত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া বিষয়টি ভারত সরকারকে জানিয়েছে।

রেডিও পাকিস্তানের স্বীকারোক্তি

রেডিও পাকিস্তান এদিন এক খবরে স্বীকার করে, যশোরের কাছেই প্রচণ্ড লড়াই চলছে। যশোর বিপন্ন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক ও পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি বিভিন্ন এলাকা সফরের অংশ হিসেবে এদিন হিলিতে পাকিস্তানি বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটি পরিদর্শন করেন।

সূত্র: ‘রাধানগর যুদ্ধ’, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এস আই এম নুরুন্নবী খান বীর বিক্রম, প্রথম আলো, ২৬ মার্চ ২০১৩; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ২৮ ও ২৯ নভেম্বর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান