default-image

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৫ নভেম্বর দিল্লিতে বলেন, দ্রুত বা ক্রোধবশত বাংলাদেশ সম্পকে৴ ভারতের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া অনুচিত। বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনি মাত্রই কথা বলে এসেছেন। সমস্যার বিভিন্ন দিক এবং বিপদের আশঙ্কা তিনি তাঁদের বুঝিয়ে বলেছেন।

এদিন সকালে বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ইন্দিরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমেও পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাঁর বিদেশ সফরে দেশগুলো বাংলাদেশ সংকট আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে।

বিজ্ঞাপন

ইন্দিরা গান্ধী সংসদীয় দলের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, সমস্যা সমাধানের জন্য সব উপায় পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এ সময়ে দেশে ঐকে৵র প্রয়োজন খুব বেশি।

সংসদে ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সাম্প্রতিক সফর নিয়ে বলেন, বাংলাদেশের মানুষের ওপর সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কোনো দেশের নেই। বহু দেশই বুঝেছে, বাংলাদেশের নির্বাচিত নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের আইনসংগত ইচ্ছানুযায়ী রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের না করে অন্যদের সমস্যার মীমাংসা করতে গেলে লাভ হবে না। তাঁরা বুঝেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি অত্যন্ত জরুরি। তাঁরা সেটি পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের বোঝাতেও চান।

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম সংসদে ঘোষণা দেন, বাংলাদেশ পরিস্থিতির সন্তোষজনক সমাধান এবং শরণার্থীর দেশে না ফেরা পর্যন্ত সীমান্ত থেকে ভারত তার সেনা সরাবে না। ভারত আক্রান্ত হলে যুদ্ধ হবে পাকিস্তানেরই মাটিতে। তিনি আশা করেন, যুদ্ধের পথ ছেড়ে পাকিস্তান নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাধান মেনে নেবে।

সরকার ও মুক্তিবাহিনী

বাংলাদেশ সরকারের একজন মুখপাত্র সাংবাদিকদের বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা রংপুরের প্রায় ১ হাজার ২০০ বর্গমাইল এলাকা থেকে পাকিস্তানি বাহিনীকে হটিয়ে দিয়েছে। সাত লাখ অধিবাসীর এই মুক্ত এলাকায় বেসামরিক প্রশাসন চালু করা হচ্ছে।

মুজিবনগরে মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে বলা হয়, কুষ্টিয়া অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। এরই মধে৵ তাঁরা যশোরের আলীগঞ্জ থেকে দর্শনা পর্যন্ত রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। এটি পাকিস্তানিদের বিশেষভাবে কাবু করেছে। এলাকাটি রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

মুক্তিবাহিনীর মুখপাত্র আরও জানান, কুষ্টিয়ায় পাকিস্তানিরা চরম আঘাত পাবে। এখানে শুধু যে রেল যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন, তা নয়; অর্থনৈতিক সংকটও দেখা দিয়েছে। এতে ওই এলাকায় থাকা পাকিস্তানি সেনাদের মনোবল প্রায় ভেঙে পড়েছে। রাতের বেলা সবাই শিবিরে বন্দী থাকে।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়, কুষ্টিয়া জেলার বেশ কয়েকটি সীমান্তচৌকি মুক্তিবাহিনী দখল করেছে। ওই জেলার প্রায় ৯০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাও মুক্তিবাহিনীর দখলে। জীবননগরে পাকিস্তানি বাহিনীর শিবিরে মুক্তিযোদ্ধারা প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে দর্শনা-আলীগঞ্জ এবং আলীগঞ্জ-যশোর ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল থেকে পাঠানো এই দিন প্রকাশিত এক খবরে দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ–এর সংবাদদাতা জানান, আগামী এক মাসের মধ্যে গেরিলারা ঢাকা আক্রমণের জন্য তৈরি হচ্ছেন।

২ নম্বর সেক্টরের নারায়ণগঞ্জ এলাকার গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা বোমা ছুড়ে নারায়ণগঞ্জে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত করেন।

মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সের প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা সিলেটের জকিগঞ্জ দখল করেন। ৪ ও ৫ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি দল এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৫৯ মাউন্টেন ব্রিগেড ও ৮১ মাউন্টেন ব্রিগেডের সম্মিলিত শক্তি সিলেট দখল করার পরিকল্পনা হয়। অক্টোবরের মাঝামাঝি তাদের সঙ্গে জেড ফোর্স যোগ দেয়। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে সুরমা নদী অতিক্রম করে আটগ্রাম-চরখাই-সিলেট অক্ষের চারগ্রামে পৌঁছায়। তাদের এই অভিযানের অংশ হিসেবে পথিমধ্যে জকিগঞ্জের পাকিস্তানি অবস্থানটি আয়ত্তে নেওয়াটা জরুরি ছিল। ১৫ নভেম্বর প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা জকিগঞ্জ দখল করেন।

মুক্তিবাহিনী সকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর বিস্তৃত এলাকা দখল করে। যুদ্ধে বহু পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়।

পাকিস্তানে তৎপরতা

পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত উর্দু দৈনিক মাশরিক–এর ১৪ নভেম্বর সংখ্যায় লন্ডন থেকে তাদের সংবাদদাতার পাঠানো খবরে বলা হয়, বিশ্বস্ত সূত্রের মতে, চীন পাকিস্তানকে জঙ্গি বোমারু বিমান, অন্তরীক্ষে ক্ষেপণযোগ৵ মিসাইল ও ভারী ট্যাংক সরবরাহ শুরু করেছে। চীনা সামরিক সরঞ্জামের প্রথম চালান একটি সমুদ্রগামী জাহাজে ইতিমধে৵ পাকিস্তানে পৌঁছেছে। দ্বিতীয় চালানও কারাকোরামের পথে পাকিস্তানে এসে পৌঁছেছে। দ্বিতীয় চালানে বিমানবিধ্বংসী কামান ও ট্যাংকবিধ্বংসী রকেটও আছে।
লাহোরে সাতটি দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পাটির প্রধান নুরুল আমিনের নেতৃত্বে একটি জোট গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।

সূত্র: স্বাধীনতাসংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি, আবদুল মতিন, র‍্যাডিক্যাল পাবলিকেশনস, লন্ডন, যুক্তরাজ্য; ইত্তেফাক, ঢাকা, ১৬ নভেম্বর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ১৬ ও ১৭ নভেম্বর ১৯৭১; দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, যুক্তরাজ্য, ১৫ নভেম্বর ১৯৭১; দ্য টাইমস, লন্ডন, যুক্তরাজ্য, ১৫ নভেম্বর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান