default-image

দিল্লিতে ৯ ডিসেম্বর রাতে ঘোষণা করা হয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কী রণকৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে, তা নিয়ে গত কয়েক দিন আলাপ-আলোচনার পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি সামরিক যুদ্ধ কমান্ড গঠিত হয়েছে। ভারতের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং বাংলাদেশের পক্ষে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ঘোষণায় আরও বলা হয়, মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী একযোগে কাজ করছে। এ চুক্তিতে দুই বাহিনীর সমঝোতার আইনগত ভিত্তি দেওয়া হলো। দুই বাহিনী পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। দায়িত্ব থাকবে ভারতীয় বাহিনীর কমান্ডে।

বাংলাদেশ থেকে বিদেশিদের অপসারণের জন্য ঢাকা বিমানবন্দরে বিদেশি বিমান নির্বিঘ্নে অবতরণের সুবিধা দিতে ভারত সম্মতি দেয়। এ জন্য ১০ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঢাকা বিমানবন্দরে কোনো আক্রমণ না চালাতে ভারতীয় বিমানবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

দিল্লির সরকারি একটি সূত্র জানায়, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে তোলা প্রচারণার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে জোর চেষ্টা চালাতে জাতিসংঘে ভারতীয় প্রতিনিধিদলকে শক্তিশালী করার জন্য পররাষ্ট্রসচিব টি এন কাউল এবং সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি পার্থসারথীকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কাউল প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিংও নিউইয়র্ক যেতে পারেন।

ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল শ্যাম মানেকশ বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশে বলেন, ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাঁচতে চাইলে তাঁদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

ঢাকার দ্বারপ্রান্তে চূড়ান্ত লড়াই

বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের চূড়ান্ত লড়াই এ সময় রাজধানী ঢাকার দ্বারপ্রান্তে। চারদিক থেকে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গড়া যৌথ বাহিনী ঢাকার দিকে এগোচ্ছে। একটি দল ঢুকছে আশুগঞ্জ দিয়ে ভৈরব বাজার হয়ে। আশুগঞ্জে যুদ্ধে নতি স্বীকার করে মেঘনার বিরাট রেলসেতু ভেঙে দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা পালিয়েছে। আরেকটা দল এগোচ্ছে দাউদকান্দির দিক দিয়ে। সেখান থেকে পাকিস্তানি বাহিনী পালিয়েছে। উত্তর দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা এগোচ্ছেন জামালপুর হয়ে। পশ্চিমে যৌথ বাহিনী মধুমতীর তীরে। সেটি পেরোলেই পদ্মা। কুষ্টিয়ার দিক থেকে আরেকটি বাহিনী এগোচ্ছে গোয়ালন্দ ঘাটের দিকে। চূড়ান্ত লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেবে মিত্রবাহিনীর সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী। চূড়ান্ত লড়াই শুরুর প্রথম দিন থেকেই ভারতীয় বিমানবাহিনী ঢাকায় আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে। ভারতীয় নৌবাহিনীর গানবোট পদ্মা ও মেঘনায়।

চুয়াডাঙ্গা ও চাঁদপুর শহরে এদিন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। ঝিনাইদহকে পাশ কাটিয়ে যৌথ বাহিনী পৌঁছে যায় কুষ্টিয়ার উপকণ্ঠে। যৌথ বাহিনী এগিয়ে চলেছে রংপুরের দিকেও। দিনাজপুরে শহরের ১০ মাইল দূরে লড়াই চলছে। কুমিল্লার সন্নিহিত ময়নামতি পাকিস্তানি সেনাদের দখলে, কিন্তু তাদের পালানোর পথ রুদ্ধ। ঢাকার উত্তর-পূর্বে আশুগঞ্জ ফেরিঘাট যৌথ বাহিনীর দখলে। যৌথ বাহিনী খুলনার দিকে এগোচ্ছে। যৌথ বাহিনী জামালপুর ঘিরে রেখেছে। পতন যেকোনো মুহূর্তে।

দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশন

দিল্লিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মিশন। বাংলাদেশের পতাকা তুলে উদ্বোধন করেন মিশনপ্রধান হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি ভারতকে কৃতজ্ঞতা জানান।

বাংলাদেশের জনগণের হাতে ধরা পড়া পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য এদিন বাংলাদেশ সরকার নির্দেশ দেয়। নির্দেশে বলা হয়, ধৃত পাকিস্তানিদের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দাবি করা হবে এবং পাকিস্তান থেকে পাঁচ লাখ বাঙালিকে নিরাপদে স্বদেশে ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে।
মুজিবনগরে এদিন সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মুক্ত এলাকায় বেসামরিক প্রশাসনের কার্যক্রম শুরু এবং খাদ্য, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

বাংলাদেশ সরকার এদিন সেনানিবাস বাদে মুক্ত কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেসামরিক প্রশাসনব্যবস্থা চালু করে। ৯ মাস পর সেখানে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে আসে। বাংলাদেশ সরকার ও আওয়ামী লীগের যৌথ উদ্যোগে কুমিল্লায় এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত ৯ মাস যাঁরা পাকিস্তানি বেয়নেটের মুখে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। মুক্তিবাহিনী পুলিশের দায়িত্ব নেয়।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা ও যুগান্তর, কলকাতা, ভারত, ১০ ও ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান