default-image

ফ্রান্স ৯ নভেম্বর ভারতকে জানায়, বাংলাদেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অবস্থান ভারতের খুবই কাছাকাছি। ভারত উপমহাদেশে উত্তেজনা প্রশমনের জন্য ফ্রান্স কূটনৈতিকভাবে সাহায্য করবে।

সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী দেলমাসের বৈঠকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা সম্পর্কে ফ্রান্স উৎকণ্ঠা জানায়।

ফরাসি সরকার বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমাধান এবং অবিলম্বে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি চায়।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট জর্জ পম্পিদুর সঙ্গেও ইন্দিরার আলোচনা হয়। তিনিও জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে মত প্রকাশ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি দেশটির সিনেটে বক্তৃতায় বলেন, পাকিস্তানকে অস্ত্র সাহায্য করার জন্য যেসব অস্ত্রশস্ত্র ইতিমধ্যেই জাহাজে তোলা হয়েছে, সেগুলোও বন্ধ করা উচিত।

পূর্ব বাংলার উত্তেজনা প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
সিঙ্গাপুরের পাকিস্তান হাইকমিশনের কর্মচারী আলী আহমদ এদিন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আনুগত্য জানান।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তান একা হয়ে যাবে

ব্রিটেনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় ৯ নভেম্বর সম্পাদকীয় নিবন্ধে মন্তব্য করা হয়, ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ হলে পাকিস্তান একা, পরিত্যক্ত ও নিন্দিত হয়ে পড়বে।

ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত ইয়াহিয়া খানের বিপরীতে বয়ে চলেছে। যুদ্ধ বাধলে ভারতের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা সুদূর পরাহত।
দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ-এ সম্পাদকীয় মন্তব্যে বলা হয়, শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে বাংলাদেশ সমস্যা সমাধানে নতুন প্রচেষ্টা না নেওয়া পর্যন্ত ইয়াহিয়া খান বহির্বিশ্বে ক্রমেই সমর্থনহীন হয়ে পড়বেন।

ভুট্টোর চীন সফরের উদ্দেশ্য সফল হয়নি বলে মনে হচ্ছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সংবাদপত্র প্রাভদায় এক নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের শরণার্থীদের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তার সঙ্গে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার উপযুক্ত অবস্থা সৃষ্টির দায়িত্ব পাকিস্তান সরকারের।

পাকিস্তানের চরমপন্থী কিছু লোক বর্তমান অবস্থার জন্য ভারতকে দোষী করতে এবং সংঘর্ষ বাধাতে আগ্রহী।
মালয়েশিয়ার জাকার্তা টাইমস সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলে, জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাম্প্রতিক চীন সফর পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সমর্থনের যে প্রতিশ্রুতি ভারত পেয়েছে, তার তুলনায় পাকিস্তানের কাছে চীনের প্রতিশ্রুতি অনেক কম।

ভারতে যা ঘটল

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (প্রতিমন্ত্রী) কে সি পন্থ দিল্লিতে বলেন, বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আলোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

তিনি সফর শেষে ফিরে এলেই পর্যালোচনা হবে। পন্থ বলেন, বাংলাদেশ সমস্যার মূল কথাটি অনেকেই বুঝতে পেরেছেন এবং এর রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনও স্বীকার করেছেন। পন্থ বলেন, বাংলাদেশের ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে আগামী দু-তিন মাস খুবই সংকটপূর্ণ সময়।
ভারতে সফররত সোভিয়েত সংসদীয় দলের নেতা কুদরিয়াতসেভ বাংলাদেশ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দিল্লিতে বলেন, কোনো না কোনো প্রকারে বৃহৎ শক্তিকে জড়িয়ে বিশ্বের কাছে আরেকটি ভিয়েতনাম বা পশ্চিম এশিয়া এখন অসহনীয়।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের তৎপরতা

বেইজিংয়ে উচ্চপর্যায়ের পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে ফিরে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তান পিপলস পার্টি চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেন। গতকাল তিনি ফিরেছেন।
শরণার্থীদের সাহায্য ও পুনর্বাসন সম্পর্কে আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে এসে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলাপ করেন।
পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন এদিন ঘোষণা করে, পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ৭৮টি শূন্য আসনের উপনির্বাচনে ৫৮ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৫ জন জামায়াতে ইসলামী, ১২ জন পিডিপি, ২০ জন মুসলিম লীগ, ৬ জন নেজামে ইসলামী ও ৫ জন পিপিপির প্রার্থী।
অধিকৃত বাংলাদেশে পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষের বিশেষ সামরিক আদালত এক রায়ে ১৩ জন সিএসপি, ৪২ জন ইপিসিএস কর্মকর্তা ও ৪ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের প্রত্যেককে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডসহ অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়।

সাজাপ্রাপ্ত অধ্যাপকেরা হলেন মোজাফ্‌ফর আহমদ চৌধুরী ও আবদুর রাজ্জাক, খান সারওয়ার মুরশিদ এবং মযহারুল ইসলাম।
পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) সভাপতি নুরুল আমিন জামায়াতে ইসলামীর প্রধান মাওলানা মওদুদির সঙ্গে বৈঠক শেষে ঘোষণা করেন, দেশের দক্ষিণপন্থী দলগুলো জোট গঠনে রাজি। শিগগিরই সম্মিলিত ঘোষণা দেওয়া হবে।

মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযান

২ নম্বর সেক্টরের ঢাকা নগরী এবং এর আশপাশে অভিযানের জন্য বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল এদিন ঢাকা নগরীর সিদ্ধেশ্বরীতে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। আরেকটি গেরিলা দল ঢাকার গেন্ডারিয়া স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এই সেক্টরের বিলোনিয়া অঞ্চলে ৯ নভেম্বরও সারা দিন যুদ্ধ হয়। বিকেলে তিনটি পাকিস্তানি বিমান মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে বোমাবর্ষণ করে।

মুক্তিযোদ্ধাদের একজন শহীদ ও একজন আহত হন। তবে মুক্তিবাহিনী তাদের একটি অবস্থান পাকিস্তানিদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করে। মুক্তিযোদ্ধারা উত্তর চিতলিয়া দখল করেন।
৮ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের রাজাপুরে রাজাকারদের একটি টহল দলকে অ্যামবুশ করলে দুজন নিহত এবং চারজন বন্দী হয়।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর আট; ইত্তেফাক, ঢাকা, ১০ নভেম্বর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ১০ ও ১১ নভেম্বর ১৯৭১; দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, ৯ নভেম্বর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান