default-image

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এএফপি ১৩ জুলাই জানায়, বিশ্বব্যাংক মিশনের এক গোপন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অতি করুণ ছবি ফুটে উঠেছে। ইয়াহিয়া খানের সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ত্রাসের রাজ্য সৃষ্টি করেছে। মানুষ আতঙ্কিত। সারা দেশে দুর্ভিক্ষ। বিশ্বব্যাংকের এই মিশনের নেতৃত্ব দেন ব্রিটেনের নাগরিক পিটার এস কারগিল। দলে নয়জন সদস্য ছিলেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে পাকিস্তানি সেনাদের সরিয়ে সেখানে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নানা তৎপরতা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ (কংগ্রেস) এদিন রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসে। শরণার্থী সমস্যায় ভারতকে সাহায্য করার জন্য অতিরিক্ত ১৭ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব বৈঠকে অনুমোদিত হয়। বৈঠকে ৪১ জন প্রতিনিধি যুক্ত বিবৃতিতে অবিলম্বে পাকিস্তানকে জাহাজবোঝাই সমরাস্ত্র পাঠানো বন্ধ করার আহ্বান জানান। প্রেসিডেন্ট নিক্সন অবশ্য বলেছেন, পাকিস্তানকে অস্ত্রের জন্য নতুন করে আর কোনো লাইসেন্স দেওয়া হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র চার্লস ব্রে ওয়াশিংটনে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার পাকিস্তানকে আহ্বান জানিয়েছে। তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে শান্তি বিধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার কোনো ফর্মুলা দেয়নি। তবে পূর্ব পাকিস্তানে সেনা হ্রাস এবং অসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা না হলে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে না।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন কর্মকর্তা এদিন জানান, পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থার কথা মনে রেখে ইয়াহিয়া খান নতুন করে উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সাহায্য দেওয়া বন্ধ রাখবে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে কোনো প্রস্তাব তাঁরা পেশ করেননি বলে জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি দেশটির সরকারের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তাতে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়, অবিলম্বে নতুন করে খাদ্য পাঠানো না হলে পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ মানুষ অনাহারে মারা যাবে। পূর্ব বাংলার খাদ্যের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের সম্যক জ্ঞান নেই। ত্রাণ কর্মসূচির মধ্যেও নেই সমন্বয়।

আয়ারল্যান্ডের মধ্যস্থতার প্রস্তাব

আইরিশ পার্লামেন্টের সদস্য স্যার অ্যান্থনি চেলস এসমন্ড ও ড. উইলিয়াম লাউনাগে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বাংলাদেশ সংকট নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনার শেষে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে তাঁর দেশের মধ্যস্থতার প্রস্তাব এখনো বহাল আছে। এ নিয়ে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতির কার্যকরী কমিটি দিল্লিতে এক সভায় ৮ আগস্টকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। কমিটির সভাপতি ড. ত্রিগুণা সেন ভারতের সব রাজনৈতিক দল ও গণতান্ত্রিক সংস্থাকে দিনটি পালনের আহ্বান জানান। ওই দিন সভা ও বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে শেখ মুজিবের মুক্তির বিষয়ে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির সম্পাদক অধ্যাপক দিলীপ চক্রবর্তী জানান, সমিতির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর নৃশংসতা ও গণহত্যা সম্পর্কে একটি ছবির অ্যালবাম প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্ব জনমত তৈরি করতে বিভিন্ন দেশে এই অ্যালবাম পাঠানো হবে।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের একজন মুখপাত্র জানান, সরকারি হিসাবে পশ্চিম দিনাজপুরের মালন শিবিরে ৩৩ হাজার ১৫২ জন শরণার্থী কলেরা ও উদরাময়ে আক্রান্ত হন। মারা গেছেন ৪ হাজার ৫০৫ জন। সরকারি হিসাবে পশ্চিমবঙ্গে এ পর্যন্ত শরণার্থী এসেছেন ৫২ লাখ ২৫ হাজারের মতো।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিবাহিনীর অভিযান

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মুক্তিবাহিনীর চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি দল মর্টারের সাহায্যে মন্দভাগ বাজার ও নাক্তের বাজারে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থানে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত এবং কয়েকটি বাংকার ধ্বংস হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধাদের চারজন আহত হন।

কুমিল্লার দাউদকান্দির উত্তরে গোমতী নদীতে মুক্তিবাহিনীর একটি অ্যামবুশ দল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি টহল স্পিডবোটকে আক্রমণ করে। এতে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়।

চুয়াডাঙ্গায় মুক্তিবাহিনীর একটি দল দর্শনায় পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ করলে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়।

ইয়াহিয়ার সংবিধান

পাকিস্তান টাইমস-এর সম্পাদক জেড এ সুলেরি জানান, পাকিস্তানের সংবিধান তৈরির জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে। প্রস্তাবিত সংবিধানে বর্তমানের যুক্ত নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তে ইসলামিক ভ্রাতৃত্ববোধ পুনরুদ্ধারের জন্য পৃথক নির্বাচনব্যবস্থা থাকবে। মুসলমান প্রার্থীরা যাতে অমুসলিম ভোটারদের ওপর নির্ভরশীল না থাকেন, তার জন্যই এই ব্যবস্থা। সংবিধানে দুই সভার ফেডারেল সরকার গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। দুই সভার সদস্যসংখ্যা এবং ক্ষমতা ভাগাভাগি হবে প্যারিটির ভিত্তিতে। প্রাদেশিক সরকারের হাতে ক্ষমতা তেমন বেশি থাকবে না।

বার্তা সংস্থা পিপিআই পরিবেশিত খবরে বলা হয়, ব্যবসায় মন্দার কারণে পাকিস্তানি শিল্পপতিরা তাঁদের প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ছাঁটাই শুরু করেছেন। কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি ভিত্তিতে নিযুক্ত কর্মচারীদের লে-অফ করতে শুরু করেছে। অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে লে-অফ করার কৌশল নিয়েছে।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই ও আট; ইত্তেফাক, ১৪ ও ১৫ জুলাই ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, ভারত, ১৪ ও ১৫ জুলাই ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান’