default-image

ভারত সরকারের পররাষ্ট্রসচিব টি এন কাউল ৭ সেপ্টেম্বর মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন। সকালে কলকাতার দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছেই তিনি সরাসরি মুজিবনগরে যান।

বিজ্ঞাপন

প্রথমে তিনি তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আলোচনা করেন; সন্ধ্যায় খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে। বাংলাদেশ সরকারের সামরিক ও বেসামরিক প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তিনি কথা বলেন। তাঁরা টি এন কাউলকে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা কর্মকাণ্ডের বিশদ প্রতিবেদন দেন।

বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য করার জন্য একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের চেষ্টা চলছিল। টি এন কাউল বাংলাদেশ সরকারের নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়েও কথা বলেন।

বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রসচিব মাহবুবুল আলম চাষী দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর তিনি ভারতের টি এন কাউলের সঙ্গে দেখা করেন।

মাহবুবুল আলম চাষীর দিল্লি সফর ছিল রহস্যজনক। এ ব্যাপারে মঈদুল হাসান তাঁর মূলধারা ’৭১ বইটিতে লিখেছেন, ‘প্রস্তাবিত ঐক্যফ্রন্টকে দুর্বল “উপদেষ্টা কমিটি” পরিণত করার ক্ষেত্রে সর্বাধিক কার্যকর ভূমিকা ছিল খোন্দকার মোশতাকের। আওয়ামী লীগের “নিরঙ্কুশ অধিকারকে জলাঞ্জলি দিয়ে” বহুদলীয় কমিটি গঠন করার ফলে আওয়ামী লীগের যে অংশ ক্ষুব্ধ হয়, তাদেরকে তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে পরিচালিত করার ক্ষেত্রেও মোশতাক সক্রিয় ছিলেন। অথচ নিজের নিউইয়র্ক যাওয়া যাতে সম্ভব হয়, এ জন্য সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক মহলের জন্য তাঁর বাহ্যিক ভূমিকা ছিল অন্য রকম। জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হওয়ার পাঁচ দিন আগে, যখন এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন প্রবাসী নেতৃত্ব গোপনীয়তা বজায়ের চেষ্টা করছিলেন, এমনকি ভারতীয় পত্রপত্রিকায়ও দৃশ্যত যখন এ বিষয়ের কোনো হদিস পায়নি, তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার সংবাদদাতার কাছে ঘোষণা করেন যে শীঘ্রই “ঐক্যবদ্ধ মুক্তিফ্রন্ট” গঠিত হতে চলেছে এবং “এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাশিয়ার সমর্থন লাভ সম্ভব হতে পারে।” ৫ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্রসচিব মাহবুবুল আলম চাষীকে তিনি দিল্লি পাঠান মুখ্যত তাঁর প্রত্যাশিত ভ্রমণ সম্পর্কে ভারতের সহায়তা লাভের উদ্দেশ্যে।

আবু সাঈদ চৌধুরীর জনসংযোগ

যুক্তরাজ্য ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এই দিন নরওয়ে থেকে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে যান। সুইডেনে পাকিস্তান দূতাবাসের সাবেক বাঙালি কূটনৈতিক কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। আবদুর রাজ্জাক মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেন।

স্টকহোমে পৌঁছে আবু সাঈদ চৌধুরী নোবেল–বিজয়ী অর্থনীতিবিদ গুনার মিরডালের সঙ্গে দেখা করেন। আবু সাঈদ চৌধুরী তাঁকে স্থানীয় বাংলাদেশ অ্যাকশন কমিটির চেয়ারম্যান পদ গ্রহণের অনুরোধ করলে মিরডাল রাজি হন।

আবু সাঈদ চৌধুরী বিকেলে ক্ষমতাসীন সুইডিশ সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টির মহাসচিব স্টেন অ্যান্ডারসনের সঙ্গে দেখা করেন। আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার পর অ্যান্ডারসন বলেন, তাঁর পার্টির সমর্থন আছে। তবে বাংলাদেশকে আসল সাহায্য করতে হলে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র দিতে হবে। তিনি তাঁদের পার্টির মাধ্যমে অস্ত্র সরবরাহ করার চেষ্টা করবেন বলে আশ্বাস দেন।

বিজ্ঞাপন

গেরিলা অভিযান

৬ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল এই দিন পঞ্চগড়ের জগদলহাটে পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানে আক্রমণ চালায়। পাকিস্তানি সেনারা পর্যুদস্ত হয়ে পিছু হটলে মুক্তিযোদ্ধারা জগদলহাট দখল করে নেন। কিছুক্ষণ পর পাকিস্তানি বাহিনী গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তা নিয়ে মুক্তিবাহিনীর ওপর পাল্টা হামলা করলে মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চাদপসরণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি দল তিন দিনব্যাপী যুদ্ধের পর এই দিন তিস্তা নদীর তীরবর্তী শঠিবাড়ি বন্দর মুক্ত করে।

৮ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা সাতক্ষীরায় পাকিস্তানি বাহিনীর ঝাউডাঙা অবস্থানে আক্রমণ চালায়। এতে পাকিস্তানি বাহিনীর কয়েকজন পাঞ্জাবি পুলিশ হতাহত হয়। ৮ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের অন্য একটি দল মধুখালী-দোসাতিনা সড়কে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও রেঞ্জারদের সম্মিলিত একটি দলকে অ্যামবুশ করে। অ্যামবুশে পাকিস্তানি সেনাদের কয়েকজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়। মুক্তিবাহিনীর আরেকটি দল গোয়াল গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দলের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ করে। এতে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। মুক্তিবাহিনীর তিনজন গুরুতর আহত ও পাঁচজন নিখোঁজ হন।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ৬ ও ৮; মূলধারা ’৭১, মঈদুল হাসান, ইউপিএল, ঢাকা; স্বাধীনতাসংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি, আবদুল মতিন, র‌্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকসেন্স, লন্ডন; পূর্বদেশ, ঢাকা, ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকাযুগান্তর, কলকাতা, ভারত, ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান