default-image

১৯৭১ সালের ২ মে বাংলাদেশ সরকার একটি বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, শত্রু–সেনাদের সাহায্য করে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করছেন, মানুষ তাদের ক্ষমা করবে না। তাদের কাজের জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।

বুদাপেস্ট শান্তি সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার আবদুস সামাদ আজাদকে নির্বাচন করে। বিশ্ব শান্তি কমিটি শান্তি সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠাতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল।

সরকার তাদের প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এই দিন বেতন দেওয়া হয়। কর্মকর্তা–কর্মচারীদের অনেকেই বেতনের একটি অংশ সরকারের মুক্তিসংগ্রাম তহবিলে জমা দেন।

বাংলাদেশের পিরোজপুরে সিরাজ শিকদার গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটির সভানেত্রী এবং প্রধান কমান্ডার হন যথাক্রমে স্ত্রী জাহানারা বেগম এবং শাহনেওয়াজ। তাদের আওতাভুক্ত এলাকাকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হয়।

ভারতে বাংলাদেশের পক্ষে

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই দিন বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনার জন্য ৭ মে বিরোধী দলের নেতাদের বৈঠক ডাকেন। তাঁর সরকার বাংলাদেশ সম্পর্কে কী ভাবছে, সে সম্পর্কে তিনি বিরোধী দলের নেতাদের অবহিত করবেন বলে জানান। শরণার্থীদের প্রসঙ্গও কথা হবে বলে জানানো হয়।

পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক কনভেনশন বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দিতে ভারত সরকারের প্রতি দাবি জানায়। কনভেনশনে বক্তব্য দেন জ্যোতি বসু, হরেকৃষ্ণ কোঙার, বিমলচন্দ মুখার্জি প্রমুখ।

ভারত সরকারি জানায়, সেখানে আগত বাংলাদেশি শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৬৭ হাজার ৪২৮। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী জানান, ত্রিপুরায় প্রায় আড়াই লাখ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের বৈদেশিক সাহায্য বিষয়ক কমিটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সংক্রান্ত উপ-কমিটির চেয়ারম্যান কর্নেলিয়াস গ্যালাঘার কলকাতায় বলেন, শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানে অতি মাত্রায় বর্বরতা ও গণহত্যা চলেছে। কিছুদিন আগেও এটি পাকিস্তানের ঘরোয়া বিষয় ছিল, কিন্তু পাঁচ লাখ লোক দেশান্তরি হওয়ার পর এটি আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের তৎপরতা

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, দেশের একটি অংশে সামরিক আইন বলবৎ রেখেও অন্য অংশে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যেতে পারে।

কাইয়ুম মুসলিম লীগের প্রধান খান আবদুল কাইয়ুম খান পাকিস্তানের রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণের জন্য শাসনতন্ত্র জারির সুপারিশ করেন।

মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর খান খুলনায় শান্তি কমিটি আয়োজিত এক সভায় মুক্তিযোদ্ধাদের নিমুর্লের কাজে নিয়োজিত পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে সহযোগিতার আহ্বান জানান।

এই দিন সকালে পাকিস্তানি সেনারা খাগড়াছড়ির রামগড়ে মুক্তিবাহিনীর ওপর তীব্র হামলা করে। সারাদিন যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের সাবরুমে আশ্রয় নেয়। পাকিস্তানি সেনারা রাতে রামগড়ের দখল নিয়ে হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগ করে এলাকায় বিভীষিকা কায়েম করে।

পাকিস্তানি সেনারা ফরিদপুরের অদূরে হিন্দু অধ্যুষিত ঈশান–গোপালপুর গ্রামে গণহত্যা চালায়। স্থানীয় সহযোগীদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা ফরিদপুর থেকে সেখানে আসে। লক্ষ্মী দাসের হাট নামে একটি জায়গায় তাদের যান থামিয়ে ঈশানশঙ্করের বাড়ির দিকে এগোয়। গ্রামবাসী পালানোর সময় তারা ২৯ জনকে আটক একটি জলাধারের কাছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী সকাল প্রায় ৮টায় ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরে রাধিকাপুর স্টেশন এবং তার আশেপাশে গোলাবর্ষণ করে। গোলায় রাধিকাপুর স্টেশন বিধ্বস্ত এবং কয়েকজন হতাহত হয়। রেল কর্তৃপক্ষ স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া ত্রিপুরার সাবরুমে পাকিস্তানি বাহিনী গোলাবর্ষণ করলে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক ও সাত; দৈনিক পাকিস্তান, পূর্বদেশআনন্দবাজার পত্রিকা, ৩ মে ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান