default-image

ভারতের রাজস্থান রাজ্যের বিধানসভার সরকার ও বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন সদস্য ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেন। তাঁরা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি দাবি জানান। বিধানসভার প্রস্তাবে অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ইয়াহিয়া খানের জুলুম থেকে বাংলাদেশের মানুষকে রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ভারত সরকারকে অনুরোধ করা হয়।

ভারতের নয়াদিল্লিতে সিপিআই নেতা হীরেন মুখার্জি বলেন, পূর্ববঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত লোকসভার অধিবেশন ডাকা প্রয়োজন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন ভারতে ঢুকে ভারতীয় নাগরিক হত্যা করছে, তখন কোনো সংসদীয় রাষ্ট্র সংসদ বন্ধ রাখতে পারে না।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম সহায়ক সমিতির সভাপতি অজয় মুখোপাধ্যায় এক বিবৃতিতে বলেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা এবং দুর্গত মানুষের প্রয়োজন ওষুধ, খাদ্য, বস্ত্র, নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী ও অর্থ। এসব প্রয়োজন মেটাতে এগিয়ে আসার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কয়েক শ বাঙালি মুসলমান বাংলাদেশ কূটনৈতিক মিশনের হোসেন আলীকে সংবর্ধনা জানাতে কলকাতায় আসেন। তাঁরা হাওড়া থেকে মিছিল করে সার্কাস অ্যাভিনিউর মিশনে আসেন। আঞ্জুমানে মহসিনিয়াত এই মিছিল ও সংবর্ধনার আয়োজন করে।

বাংলাদেশের সমর্থনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দিনে ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ শিরোনামে আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়।

লন্ডনে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

লন্ডনে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাঙালিরা বিক্ষোভ করেন। তাঁরা বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতিবাদ জানান। বিক্ষোভকারীরা ‘খুনিরা ফিরে যাও, যুদ্ধ বন্ধ করো’—এ রকম বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। পাকিস্তান ক্রিকেট দল অনুষ্ঠানে পৌঁছানোর আগেই বিক্ষোভকারীরা সেখানে হাজির হন। ক্রিকেট দলের সদস্যরা পৌঁছানোর পর পুলিশ তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের দুঃখ-কষ্ট দূর করতে জাতিসংঘের সাহায্য করার ব্যাপারটি পাকিস্তান সরকারের ওপর নির্ভর করে।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানি তৎপরতা

রেডিও পাকিস্তান এদিন জানায়, সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিনের কাছ থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান একটি চিঠি পেয়েছেন। ইসলামাবাদে পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র এ তথ্য জানালেও চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছু বলেননি।

ঢাকায় সামরিক কর্তৃপক্ষ ১ মে থেকে ফুলবাড়িয়া ও শাহজাহানপুর রেল কলোনি এবং সচিবালয় এলাকায় বসবাসকারী লোকদের সরে যেতে নির্দেশ দেয়। আরেক ঘোষণায় শহরের সব দেয়াল থেকে রাজনৈতিক স্লোগান মুছে ফেলতে বলা হয়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদ খান গত দুই দিন ময়মনসিংহ, যশোর ও খুলনায় সেনাবাহিনীর ঘাঁটি ও স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন বলে এই দিন রেডিওর এক খবরে বলা হয়।

যশোর জেলার বয়রায় থাকা পাকিস্তানি সেনারা সীমান্তের খুব কাছে থেকে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনীকে (বিএসএফ) লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এ সময় দুই পক্ষে অনেকক্ষণ পাল্টাপাল্টি গুলির ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানি সেনারা উত্তরাঞ্চলের হিলি সীমান্তেও ভারতীয় সীমানার ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে গোলাবর্ষণ করে।

পাকিস্তানি সেনারা এদিন ভারতের সীমান্তসংলগ্ন রামগড়ের কাছে হেঁয়াকুতে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটিতে আক্রমণ করে। লড়াইয়ের প্রথম দফায় মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমণে পাকিস্তানিদের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিকেলে দ্বিতীয় দফায় দুই ঘণ্টা প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর মুক্তিযোদ্ধারা চিকনছড়ায় সরে যান। পাকিস্তান সেনাবাহিনী রামগড় দখলের জন্য শুভপুর, নারায়ণহাট ও করেরহাট এলাকা দিয়ে ত্রিমুখী অভিযান চালায়।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই দিন ফেনী দখল করে। সিলেট দখলের খবরও এদিন শোনা যায়।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, চতুর্দশ খণ্ড; দৈনিক পাকিস্তানপূর্বদেশ, ৩০ এপ্রিল ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ২৯ ও ৩০ এপ্রিল ১৯৭১।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান