default-image

পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ট ১১ নভেম্বর বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশের শান্তি ও স্থায়িত্বের জন্য বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান দরকার।

এরপরই ভারত থেকে শরণার্থীরা বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন। পশ্চিম জার্মানি সফরে আসা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে দুই দিনের আলোচনার পর এই বক্তব্য দেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে পশ্চিম জার্মানি গভীরভাবে বিচলিত বোধ করছে বলেও উল্লেখ করেন উইলি ব্রান্ট।

একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, জাতিসংঘের উদ্যোগে শরণার্থী ত্রাণে তাঁর দেশ আরও অর্থসহায়তা দেবে।

বিজ্ঞাপন

উপমহাদেশের ঘটনাবলিতে গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে পশ্চিম জার্মানির সরকারের পক্ষ থেকে এদিন এক ঘোষণায় বলা হয়, এখনো সামরিক সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব। রাজনৈতিক সমাধানের জন্য তারা সাহায্য করতে প্রস্তুত।

ইন্দিরার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে উইলি ব্রান্ট পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে এ বিষয়ে চিঠি লিখেছেন।
বন থেকে দ্য গার্ডিয়ান-এর সংবাদদাতা নরম্যান ক্রসল্যান্ডের পাঠানো খবরে বলা হয়, ভারত-পাকিস্তান সমস্যা সম্পর্কে ইন্দিরা গান্ধীর অনমনীয় মনোভাব থেকে বোঝা যায়, উভয় দেশের মধ্যে যুদ্ধ আসন্ন। পাকিস্তান ভারতকে আক্রমণ করলে ভারত পাল্টা আক্রমণ করবে।
ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার এদিন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত ও পাকিস্তানকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ওয়াশিংটনের একটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, পাঁচ হাজার টন অস্ত্রবোঝাই কিছু রুশ জাহাজ ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করেছে।

৩ নভেম্বর দিল্লিতে অবতরণ করা রুশ পরিবহন বিমানেও ছিল অস্ত্রশস্ত্রের জন্য যন্ত্রাংশ। এর আগেও ১০টি রুশ পরিবহন বিমান দিল্লিতে নামে।

বাংলাদেশ সরকার

বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান ১১ নভেম্বর মুজিবনগরে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের নীতি ও কাঠামো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ হবে স্বাধীন, সার্বভৌম, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সমাজবাদী রাষ্ট্র।
কলকাতার সল্টলেকে বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সার্ভিস কোর আয়োজিত এক শরণার্থী সমাবেশে আওয়ামী লীগের নেতারা আশা প্রকাশ করেন, সেদিন আর বেশি দেরি নেই, যেদিন শরণার্থীরা স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারবে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

ঢাকায় সফল গেরিলা অভিযান

২ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা এদিন অবরুদ্ধ ঢাকার বায়তুল মোকাররম এলাকায় অভিযান চালান। তাঁরা সেখানে অবস্থানরত একদল পাকিস্তানি সেনার কাছাকাছি বোমার বিস্ফোরণ ঘটালে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়।

অভিযানে অংশ নেন রাইসুল ইসলাম আসাদসহ কয়েকজন। লুই অ্যান্ড ডুসেলডর্ফ প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারীর বাড়ি (সিদ্ধেশ্বরী) থেকে মুক্তিযোদ্ধারা একটি গাড়ি সংগ্রহ করেন পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য। এদিন দুপুর সাড়ে ১২টায় অভিযানের প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

দ্বিতীয়বার গেরিলারা গাড়ি পার্ক করেন বায়তুল মোকাররমের ফ্যান্সি হাউসের সামনে।

সেখানে ছয়জন পাকিস্তানি সেনা কলা কিনছিল। ফ্যান্সি হাউসের ভেতরে পাকিস্তানি গোয়েন্দা বিভাগের মেজর ফতেহ মোহাম্মদ মালিকসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের লোকজন কেনাকাটা করছিল।

গাড়িটি পার্ক করার পর আসাদ ছাড়া বাকি সবাই নেমে যান। এরপর আসাদ সিগারেট খাওয়ার ভান করে গাড়ির ভেতরে রাখা টাইম বোমার সেফটি ফিউজ জ্বালিয়ে গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে যান। দেড় মিনিট পর প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে সমস্ত এলাকা।
এ অভিযানে তিন পাকিস্তানি সেনা নিহত ও কয়েকজন হতাহত হয়। একজন আহত নারীকে কোলে নিয়ে মেজর ফতেহর ফ্যান্সি হাউস থেকে বেরিয়ে আসার ছবি পরদিন ঢাকার পত্রিকায় ছাপা হয়।
যুক্তরাজ্যের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর সংবাদদাতা ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থের ঢাকা থেকে পাঠানো খবরে বলা হয়, বোমা বিস্ফোরণের পর শহরের দোকানপাট ও অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে যায়।

খবরে আরও বলা হয়, গত মার্চে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা ছয় হাজার পুলিশের মধ্যে অবসাদের লক্ষণ স্পষ্ট।
২ নম্বর সেক্টরের অন্য মুক্তিযোদ্ধারা এদিন রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কৃষ্ণপুর ও বাগবাড়ি অবস্থানে আক্রমণ চালান। পরদিন পর্যন্ত যুদ্ধ অব্যাহত থাকে।

এ যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনা, রেঞ্জার্স ও রাজাকার মিলে ১৪ জন নিহত ও ৭ জন আহত হয়। মুক্তিযোদ্ধা দলের দুজন শহীদ হন। একজন আহত হন।
৮ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা এদিন রাতে চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ সড়কে পাহারারত পাকিস্তানি সেনাদের ওপর গোলাবর্ষণ করলে চারজন আহত হয়।

তাদের পাল্টা আক্রমণে একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। অন্য আরেক দল মুক্তিযোদ্ধা রাতে দামুড়হুদার রঘুনাথপুরে নদীর ঘাটে মাইন পেতে রাখেন। সে মাইন বিস্ফোরিত হয়ে কয়েকজন পাকিস্তানি হতাহত হয়।

ভারত ও পাকিস্তানে

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং এদিন নেপালের রাজা মহেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেবকে বাংলাদেশের বিশেষ পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কথা জানান।
লাহোরে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে ঢোকার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে পিস্তল থেকে গুলি ছোড়া হয়। তবে তাঁর গায়ে গুলি লাগেনি।
সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই ও আট; ইত্তেফাক, ঢাকা, ১২ নভেম্বর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ১২ ও ১৩ নভেম্বর ১৯৭১; দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, যুক্তরাজ্য, ১২ নভেম্বর ১৯৭১; দ্য গার্ডিয়ান, লন্ডন, যুক্তরাজ্য, ১৩ নভেম্বর ১৯৭১
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান