default-image

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ২৪ নভেম্বর দেশটির আইনসভার নিম্নকক্ষ লোকসভায় বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বীকৃতি নিয়ে বৈঠকে করেন। বিরোধী নেতা গোরে মারারি ইন্দিরা গান্ধীকে বলেন, ৬ ডিসেম্বরের আগেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। কারণ, ইয়াহিয়া খান সে দিন পাকিস্তানের নতুন সংবিধান চালু করবেন।
পরে লোকসভায় মুক্তিবাহিনীর সাফলে৵র কথা উল্লেখ করে ইন্দিরা বলেন, বর্ষার পর মুক্তিবাহিনীর সাফল্য পাকিস্তানের সামরিক সরকারের সব পরিকল্পনা স্পষ্টত বানচাল করে দিয়েছে।
এ দিন ভারতের কলকাতায় বাংলাদেশের ১৪ জন নাবিক আশ্রয় নেন।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের বৈঠক ডাকার আহ্বান

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের কিছু সদস্য ভারত-পাকিস্তান সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য অবিলম্বে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডাকার আহ্বান জানান।
সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস এদিন ভারত উপমহাদেশের সংকট নিয়ে সোভিয়েত সরকারের সঙ্গে আলাপ করে। আলোচনার বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
ভারত ও পাকিস্তানকে সামরিক উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার জন্য এই দিন আহ্বান জানায় ফ্রান্স।
ব্রিটেনের দ্য টাইমস পত্রিকায় এক সম্পাদকীয় মন্তব্যে বলা হয়, পাকিস্তানের দুই অংশকে একত্রে রেখে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
পাকিস্তানিরা পালানোর পথ খুঁজছে
মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে ২৪ নভেম্বর বলা হয়, মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের সামনে পাকিস্তানি সেনারা দুটি পন্থা নিয়েছে: ১. নির্বাচিত চার-পাঁচটা সেনানিবাসে আত্মরক্ষার জন্য ঘাঁটি গড়ে তোলা। ২. বাংলাদেশ থেকে দ্রুত কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং কিছু সামরিক সরঞ্জাম পাকিস্তানে সরিয়ে নেওয়া। বিমানবাহিনীর কিছু বিমানও তারা পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়েছে।

অধিকৃত বাংলাদেশে পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকাকে প্রধান ঘাঁটি করে ঢাকা বিমানবন্দর রক্ষার সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিচ্ছে। আর যশোর, সিলেট, দিনাজপুর প্রভৃতি শহর থেকে তারা পিছু হটছে।
পলায়নপর্বের জন্য পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষের আরও দু-তিন সপ্তাহ সময় দরকার। তাদের সেনাবাহিনী প্রাণপণ লড়ে ওই সময়টুকু পাওয়ার চেষ্টা করবে।
মুক্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, মুক্তিবাহিনী যশোর সেনানিবাসের দিকে ভারতীয় বাহিনীর সহায়তায় দ্রুত এগোচ্ছে। যশোর বিমানবন্দর ক্ষতবিক্ষত। সাতক্ষীরা-নাভারন এবং চৌগাছা-কালিগঞ্জ হয়ে মুক্তিবাহিনীর আরও দল ক্ষিপ্রগতিতে সেনানিবাসের দিকে এগিয়ে চলেছে। আরেকটি দল যশোর-খুলনার পথে গোলাগুলি চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানি বাহিনী অর্থ ও সম্পদ নিয়ে পালাতে ব্যস্ত।
নৌ-মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে এদিন চট্টগ্রাম বন্দরে এক হাজার টন তেলবাহী জাহাজ, মেঘনায় চীনের বাণিজ্য জাহাজ, চাঁদপুরের কাছে চারটি বড় স্টিমার এবং পাকিস্তান নৌবহরের একটি গানবোট ডুবে যায়। পাকিস্তানি বাহিনীর জরুরি সরবরাহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। চাঁদপুরের জাহাজ চলাচল বন্ধ।
সিলেট অঞ্চলে রাধানগর কমপ্লেক্স দখলের লক্ষ্যে জেড ফোর্সের তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও গণবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা ঘোরা, দুয়ারীখেল, ছাত্তারগাঁ, লুনি, জাফলং চা-বাগান, কাফাউড়া ও বাউরবাগ থেকে উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্ব দিক দিয়ে রাধানগর ও ছোটখেল অবরোধ অভিযান শেষ করেন।
৮ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার (স্বাধীনতার পর বীর বিক্রম ও কর্নেল) নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর চৌগাছা মুক্ত করেন।
১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি দল জামালপুরের বকশীগঞ্জে পাকিস্তানের শক্তিশালী ঘাঁটি অবরোধ করে মূল বাহিনী থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তান ও অধিকৃত বাংলাদেশে

পাকিস্তান সরকার এদিন সশস্ত্র বাহিনীর সবাইকে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান সামরিক কার্যালয়ে হাজির হতে নির্দেশ দেয়। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি চীনা প্রতিনিধিদল এদিন পাকিস্তানে পৌঁছেই ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা করে। আলোচনার বিষয় অজানা থাকে।
পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো ভারতের আক্রমণের প্রসঙ্গ তাড়াহুড়া করে নিরাপত্তা পরিষদে নিতে সরকারকে বারণ করেন। করাচি থেকে লাহোরে পৌঁছে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘে প্রতিনিধিত্বের একমাত্র অধিকার তাঁর। কারণ, তিনি জননেতা। তিনি বলেন, ইয়াহিয়ার ওপর বিপুল দায়িত্ব। এই সংকটময় মুহূর্তে তিনি নিষ্ক্রিয় থাকতে পারেন না।
একজন সরকারি মুখপাত্র জানান, ইয়াহিয়া খান বৃহৎ শক্তিগুলোকে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল রেখেছেন।
ওয়াশিংটন থেকে রয়টার্স জানায়, যুদ্ধের আশঙ্কা বেড়ে চলায় যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত ৩০০ মার্কিন নাগরিককে স্থানান্তর করার কথা ভাবছে।
অধিকৃত বাংলাদেশে সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা শহরে আবার সান্ধ্য আইন জারি করে। এ নিয়ে এক সপ্তাহে ঢাকায় দুবার সান্ধ্য আইন জারি করা হলো। সান্ধ্য আইনের মেয়াদ বা কারণ জানানো হয়নি।


সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ২৫ ও ২৬ নভেম্বর ১৯৭১; দ্য টাইমস, লন্ডন, যুক্তরাজ্য, ২৪ নভেম্বর ১৯৭১
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান