default-image

১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল ছিল বাংলা বছরের শেষ দিন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ বাংলার সংগ্রামী জনগণকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান।

তাজউদ্দীন আহমদ এই দিন বিশ্বের সব সাংবাদিক, বন্ধুরাষ্ট্রের সরকার ও জনতা, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্দেশ্যে একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তিনি তাঁদের বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান। শত্রুসৈন্যদের অবিলম্বে বিতাড়িত করার জন্য অস্ত্র সাহায্য করার এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে কোনো অস্ত্র সরবরাহ না করার জন্য বিশ্বের সব রাষ্ট্রকে অনুরোধ জানান।

নবগঠিত বাংলাদেশ সরকার স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের মাধ্যমে বাঙালিদের প্রতি ১০ দফার আরেকটি নির্দেশনা জারি করে। নির্দেশনার পাশাপাশি আরও বলা হয়, বাঙালিকে শোষণমুক্ত করে সুখী ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার শপথ নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে ও নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপ্রধান। আর মন্ত্রিসভায় তাঁর সহকারী হিসেবে রয়েছেন ত্যাগী নেতারা।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পেছনে ছিল দেশ-বিদেশের বহু মানুষের একক ও মিলিত চেষ্টা, অজস্র ঘটনা। এখানে রইল একাত্তরের প্রতিটি দিনের বিবরণ।
বিজ্ঞাপন

বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ কমিশনের মহাসচিব ম্যাকডরমট পাকিস্তানে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিরোধিতা করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে টেলিগ্রাম পাঠান। টেলিগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচারের জন্য বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ের খবরে আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ কমিশন দুঃখ প্রকাশ করে।

টেলিগ্রামে আরও বলা হয়, কেবল আইনের শাসনের অধীন বেসামরিক আদালতই আন্তর্জাতিক মহলকে সন্তুষ্ট করতে পারে। বিরোধী রাজনীতিবিদদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এই সংস্থা কখনোই অনুমোদন করে না। শেখ মুজিব এবং অন্য আওয়ামী লীগ নেতারা আইনের চোখে কোনো অপরাধ করে থাকলে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি দেশের বেসামরিক আদালতে তাদের বিচার না করার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বাংলাদেশের সমর্থনে সর্বভারতীয় সাহায্য সংস্থা নামে নতুন একটি জাতীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। আগের দিন এক সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক সমর গুহ নতুন এই সংগঠন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এম সি চাগলাকে এ সংগঠনের চেয়ারম্যান এবং বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কর্পুরী ঠাকুরকে নির্বাহী চেয়ারম্যান করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে সিনেটর মাস্কি এক বিবৃতিতে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে চলমান দুঃখজনক ঘটনায় তিনি ক্রমবর্ধমান হারে উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত। ঘটনা পুরোপুরি পরিষ্কার না হলেও এর মাত্রা সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলা উচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমস–এ বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে সিডনি শনবার্গের আলাদা তিনটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘অব্যাহত হত্যাযজ্ঞের মধ্যে বাঙালিদের মন্ত্রিসভা গঠন’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানি সেনাদলের আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া প্রায় সবাই প্রতিরোধযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন।

অবরুদ্ধ বাংলাদেশের চালচিত্র

পাকিস্তান বিমানবাহিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশুগঞ্জে দিনভর অব্যাহত বিমান হামলা চালায়। তাতে অগণিত মানুষ মারা যায়। পাকিস্তান সেনাদের একটি বড় দলও এই দিন কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে সড়কপথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে এগোয়। তারা উজানিসার সেতুর কাছে পৌঁছালে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর সেনা সমন্বয়ে গড়া মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে। দুই পক্ষের তীব্র লড়াইয়ে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় আরেকটা যুদ্ধ হয়। পাকিস্তান সেনাদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়ে মুক্তিবাহিনী কসবা পুনর্দখল করে।

ঢাকা থেকে আসা একদল পাকিস্তানি সেনা রাজশাহী শহরের প্রবেশপথে অবস্থান নিলে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বড় একটি অংশ শহরে ঢুকে পড়ে। বিভিন্ন স্থান থেকে ৩০ জনের মতো সাধারণ মানুষকে আটক করে শহরের একটি স্কুলে নিয়ে গুলি করে।

ভোরে ঈশ্বরদীর পাকশি রেলসেতুর ভেড়ামারা প্রান্তে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আক্রমণ করে। প্রচণ্ড যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভেড়ামারা দখল করে। ঘোড়াঘাট–হিলি রোডেও পাকিস্তান সেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়।

অন্য একদল পাকিস্তানি সেনা সান্তাহার রেল জংশন এলাকা দখল করে। স্থানীয় অবাঙালিরা তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে বহু বাঙালিকে হত্যা করে। সান্তাহার হত্যাকাণ্ড নামে ঘটনাটি পরে পরিচিতি পায়।

ঢাকায় শান্তি কমিটির স্টিয়ারিং কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। নেজামে ইসলামের প্রধান মৌলভি ফরিদ আহমদের সভাপতিত্বে এ সভার প্রস্তাবে পাকিস্তানের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পূর্ব পাকিস্তানকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, দ্বিতীয় ও ত্রয়োদশ খণ্ড; বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই ও সাত; দৈনিক পাকিস্তান, ১৫ এপ্রিল ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন